প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, পুরাণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে বেঁধে লেখার জন্য পরিচিত কানাডীয় কবি ও লেখক অ্যান কার্সন। তার সাহসী ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। নোবেল কমিটির মতে, ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ তৈরি করেছেন কার্সন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কার হিসেবে কার্সন পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা।
অ্যান কার্সনের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত ঘরানা ও কাঠামোর সীমা ভেঙে নতুন ধরনের লেখার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কবিতা, গদ্য, সংলাপ ও অনুবাদকে তিনি প্রায়ই একই সৃষ্টিতে মিলিয়েছেন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণও তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
কার্সনের বহুল আলোচিত বইগুলোর একটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এ বইয়ের ভিত্তি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিখোরোসের একটি অসম্পূর্ণ কবিতা। গ্রিক পুরাণের ডানাওয়ালা লাল দৈত্য গেরিয়নকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও কার্সনের লেখায় চরিত্রটি নতুন এক মানবিক রূপ পেয়েছে।
পুরাণের গেরিয়নের বদলে কার্সনের গেরিয়ন একজন সংবেদনশীল তরুণ। তার প্রেম, একাকিত্ব, প্রত্যাখ্যান ও আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রাচীন গল্পটি আধুনিক মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এভাবেই পুরাণকে নতুন অর্থে উপস্থাপন করেছেন কার্সন।
তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোস’। ২০০১ সালে প্রকাশিত বইটি ভেঙে পড়া এক দাম্পত্য সম্পর্কের গল্প। বইটি ২৯টি অংশে সাজানো এবং প্রতিটি অংশের শুরু হয়েছে ইংরেজ কবি জন কিটসের কবিতার পঙক্তি দিয়ে।
কিটসের প্রেম ও সৌন্দর্যের রোমান্টিক ভাবনার বিপরীতে কার্সন তুলে ধরেছেন একটি সম্পর্কের তিক্ততা, হতাশা ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা। ফলে বইটিতে একই সঙ্গে কাব্যিকতা, ব্যঙ্গ ও তীক্ষ্ণ রসবোধের উপস্থিতি দেখা যায়।
কার্সনের সাহিত্য শুধু রসবোধ ও পুরাণের নতুন ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তিগত শোকও তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ ‘নক্স’। ২০১০ সালে প্রকাশিত এ কাজটি তার ভাই মাইকেলের স্মৃতির উদ্দেশে লেখা।
‘নক্স’ প্রচলিত অর্থে শুধু একটি বই নয়, বরং বই ও শিল্পকর্মের এক ভিন্নধর্মী সংমিশ্রণ। বাক্সের মতো তৈরি এ গ্রন্থে রয়েছে ভাঁজ করা ছবি, চিঠি ও বিভিন্ন লেখা। ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে প্রাচীন রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা একটি শোকগাথা।
এভাবে কার্সনের সাহিত্যকর্মে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, শোক ও আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে যায়।
২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’ বইটিও তার প্রচলিত সাহিত্যধারার বাইরে কাজ করার প্রবণতার উদাহরণ। বইটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট রচনা রয়েছে, যেগুলো নির্দিষ্ট কোনো ক্রম মেনে পড়ার প্রয়োজন নেই।
নোবেল কমিটি কার্সনের সাহিত্যকর্মের এই বৈচিত্র্য ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাকেই বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের ভাষায়, তার সৃজনশীল কাজ ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করেছে।
ফলে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার শুধু একজন লেখকের অর্জন হিসেবে নয়, বরং সাহিত্যকে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নিয়ে যাওয়ার সৃজনশীল প্রয়াসের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
























