ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর মিরপুর, ঢাকার আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আগুন দিয়ে অবরোধের চেষ্টা করেছেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে ১১ প্লাটুন বিজিবিসহ অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে এসব এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি এবং গাজীপুরে ১০ থেকে ১২টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, আগুন
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দিগন্ত সোয়েটার কারখানার সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মহাসড়কের পাশের বর্জ্য এনে সড়কে ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। এতে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে নাওজোড় মোড় পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মতো ছোট যানবাহন চলাচলেও বাধা দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন শ্রমিককে মহাসড়কে ক্রিকেট খেলতেও দেখা যায়।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আন্দোলনরত শ্রমিকরা সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেন।
এর আগে সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মালিকানাধীন ইন্টার স্টফ কারখানার শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে মহাসড়কে আসার চেষ্টা করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা চারপাশ থেকে ঘিরে রাখায় তারা মহাসড়কে উঠতে পারেননি।
ভোগড়া, কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও মহাসড়কে আসার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
গাজীপুরে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মাঠে নামে বিজিবি সদস্যরা। গাজীপুরে মোট ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকালে বিভিন্ন এলাকার আট থেকে দশটি কারখানায় শ্রমিকরা প্রবেশ করলেও কাজে যোগ না দিয়ে বেরিয়ে আসেন। এ কারণে কারখানাগুলোতে আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সকাল ৮টার কিছু আগে কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেয়। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
আশুলিয়ায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ৭০ কারখানা ছুটি
ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও সকাল থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সকাল ৯টার দিকে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এরপর থেকে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে।
সকাল থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও সকাল সাড়ে ৮টার পর নরসিংহপুর এলাকার হামীমসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। এরপর শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন।
নিশ্চিন্তপুর, ইউনিকসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধের চেষ্টা করেন।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম ভূইয়া বেলা পৌনে ১২টার দিকে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও কাজ না করায় মালিকপক্ষ তাদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়।
মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রো স্টেশন বন্ধ
রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকরা সড়কে নামলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
পরে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে।
সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমআরটি পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহসিন শেখ জানান, সকাল ১০টা ২২ মিনিট থেকে স্টেশনটি বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো ট্রেন থামছে না। তবে মেট্রোরেলের বাকি স্টেশনগুলো চালু রয়েছে।
মহাসড়কে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই এসব শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ চলছে। মঙ্গলবারও সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।























