রাজস্ব আয় বাড়লেও ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফায় বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ লিমিটেড। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা কমেছে ২৫ শতাংশ। পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধিকে এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি।
তবে মুনাফার এই পতনের বিপরীতে বছরের প্রথম নয় মাসে বিকাশের আয় ও মুনাফা—দুটিই বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অতীতের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক-সংক্রান্ত অনিয়ম, এজেন্ট পর্যায়ে তদারকি এবং গ্রাহক সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় আসছে।
ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের অনিরীক্ষিত অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৪৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে মুনাফা ছিল ১৯৭ কোটি ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে প্রায় ৪৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপে মুনাফা কমেছে
তৃতীয় প্রান্তিকে বিকাশের নিট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৩২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব বেড়েছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
অন্যদিকে, রাজস্ব বাড়লেও নিট মুনাফা কমেছে ২৫ শতাংশ। এতে আয় ও মুনাফার প্রবৃদ্ধির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কোম্পানির বক্তব্য অনুযায়ী, মূল পরিচালন ব্যয় ও প্রশাসনিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রকাশিত তথ্যে ব্যয়ের নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক অঙ্ক দেওয়া হয়নি। ফলে কর্মী ব্যয়, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো ব্যয়, বিপণন কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে কতটা ব্যয় বেড়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
প্রথম নয় মাসে মুনাফা বেড়েছে ১০.৭ শতাংশ
প্রান্তিক মুনাফায় পতন হলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বিকাশের আর্থিক চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক।
প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ৫৫৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৫০৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ নয় মাসে মুনাফা বেড়েছে ৫৪ কোটি ২২ লাখ টাকা বা প্রায় ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
একই সময়ে বিকাশের পুঞ্জীভূত নিট রাজস্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব ছিল ৪ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে রাজস্ব বেড়েছে ৫৬১ কোটি টাকা বা প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা কমলেও বছরের প্রথম নয় মাসের সামগ্রিক হিসাবে কোম্পানিটির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
অতীতের অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ
বিকাশের আর্থিক ফলাফলের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির এজেন্ট নেটওয়ার্ক ও লেনদেন তদারকি নিয়ে অতীতেও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বিকাশের ২ হাজার ৮৮৭টি এজেন্ট হিসাবের কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮৬৩টি গ্রাহক হিসাব বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এসব এজেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল হুন্ডি ও অবৈধভাবে প্রবাসী আয় বিতরণের অভিযোগ উঠে আসে। তদন্তে আরও দেখা যায়, কিছু এজেন্ট একাধিক হিসাব পরিচালনা করছিলেন এবং কিছু হিসাবে শুধু অর্থ জমা হতো, উত্তোলন হতো না।
একই বছরের নভেম্বরে বিএফআইইউ বিকাশকে ৫০ জন সন্দেহভাজন এজেন্ট ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই এবং এজেন্ট পর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
এসব ঘটনা বিকাশের এজেন্ট ব্যবস্থাপনা ও অর্থপাচার প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
গ্রাহক অভিযোগ ও প্রতারণার ঝুঁকি
মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে প্রতারণা, ভুল লেনদেন, অননুমোদিত অর্থ স্থানান্তর এবং গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পেমেন্ট সিস্টেমস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন পেমেন্ট মাধ্যমে ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। এসব ঘটনায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিসংখ্যান পুরো এমএফএস খাতের। শুধু বিকাশের প্রতারণার ঘটনা বা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নয়। তবে দেশের বৃহত্তম এমএফএস প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশের ক্ষেত্রে গ্রাহক সুরক্ষা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
তৃতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব বৃদ্ধির তুলনায় মুনাফা কমে যাওয়ায় বিকাশের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের কোন খাতে কতটা বৃদ্ধি ঘটেছে, তা বিস্তারিত প্রকাশ করা হলে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হতো।
অন্যদিকে, অতীতের নিয়ন্ত্রক-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো এজেন্ট পর্যায়ে তদারকি, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং গ্রাহক সুরক্ষার গুরুত্ব সামনে আনে।
তবে বর্তমান আর্থিক প্রতিবেদনে নতুন কোনো অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ বা জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি। অতীতের নিয়ন্ত্রক-সংক্রান্ত ঘটনাগুলোও ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা কমার সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, বিকাশের সামনে এখন একদিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, অন্যদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক আস্থা আরও শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।






















