ঢাকা   মঙ্গলবার ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

বেক্সিমকোর ৩ হাজার কোটি টাকার গ্রিন সুকুক

পুনর্গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই সম্পদ কিনতে বিদেশি কোম্পানির তৎপরতা,

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:১১, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৩:১৪, ৩ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

পুনর্গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই সম্পদ কিনতে বিদেশি কোম্পানির তৎপরতা,

বাংলাদেশের প্রথম গ্রিন সুকুক ‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল-ইস্তিসনা’র মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২২ ডিসেম্বর। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এই বন্ডের বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে মেয়াদ ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এ লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন, ২১ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটির সুপারিশ এবং অরিজিনেটর বেক্সিমকো গ্রুপের সম্মতিসহ বেশ কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সুকুকের আওতাভুক্ত সম্পদ অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে দুবাইভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির নাম অ্যাডসাম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এলএলসি।

প্রাথমিকভাবে আগ্রহপত্র জমা দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব নিয়ে এখন আইসিবি ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মধ্যে যোগাযোগ চলছে। অন্যদিকে, অরিজিনেটর বেক্সিমকো এ উদ্যোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তির আগে সম্পদ অধিগ্রহণের আলোচনা এগোলে সুকুকের বিদ্যমান চুক্তি, সম্পদের মালিকানা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহপত্রই নয়, বেক্সিমকোর এই সুকুক ঘিরে শুরু থেকেই রয়েছে একাধিক আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত প্রশ্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগের পার্থক্য, দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি অসম্পূর্ণ থাকা, সম্পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করা নিয়ে জটিলতা, নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত আপত্তি এবং বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে সুকুকটি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।

পুনর্গঠনের উদ্যোগে নতুন বাধা

২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল-ইস্তিসনার মাধ্যমে মোট ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। তিস্তা সোলার লিমিটেড (টিএসএল), করতোয়া সোলার লিমিটেড (কেএসএল) এবং বেক্সিমকোর টেক্সটাইল বিভাগের পরিবেশবান্ধব সম্প্রসারণ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সুকুকটির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবি।

বন্ডটির মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারিত থাকায় চলতি বছরের ২২ ডিসেম্বর মূলধন ফেরত দেওয়ার সময়সীমা শেষ হচ্ছে। কিন্তু বেক্সিমকো গ্রুপের আর্থিক সংকট, টেক্সটাইল কারখানার কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থপ্রবাহ না আসায় নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে গত বছরের ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। সুকুকের বিদ্যমান আর্থিক কাঠামো, চুক্তির শর্ত, অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা এবং মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিটিকে।

কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইসিবির নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ২১ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আটটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পর্যালোচনা করে পুনর্গঠনের বাস্তবসম্মত প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ওয়ার্কিং কমিটি তিনটি সভা করে। সভায় সুকুকের আর্থিক দায়, বিদ্যমান চুক্তি, প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির প্রতিনিধিরা তিস্তা সোলার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনও করেন। পর্যালোচনা শেষে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর সুপারিশসহ প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেন। গত ২ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইসিবিকে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং বিএসইসির কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়।

১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফায় সম্মতি

পুনর্গঠন প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগকারীদের মুনাফার হার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী বার্ষিক ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা দিতে সম্মত হয়েছে সুকুকের অরিজিনেটর বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি পিএলসি। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা পরিশোধের অঙ্গীকার করে আইসিবিকে চিঠিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বিদ্যমান চুক্তিপত্র সংশোধনের শর্তে সুকুক পুনর্গঠন ও মেয়াদ বৃদ্ধিতেও সম্মতি জানায় অরিজিনেটর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আইসিবি পুনর্গঠন, চুক্তির শর্ত সংশোধন এবং মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব বিএসইসিতে জমা দেয়। বিএসইসি জানায়, ট্রাস্টি, ইস্যুয়ার ও অরিজিনেটরের প্রয়োজনীয় সম্মতি এবং কমিশনের অনুমোদন ছাড়া ট্রাস্ট ডিড সংশোধন করা যাবে না। এ ছাড়া বোর্ড অব ট্রাস্ট, শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড এবং কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছ থেকেও অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়।

এরপর অরিজিনেটর গত ১২ আগস্ট বিএসইসিতে পৃথকভাবে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দেয়। এতে সুকুকের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০৩২ পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়। প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল বকেয়া মূলধন পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত সময় তৈরি করা এবং পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া।

একই দিনে দুবাইয়ের কোম্পানির আগ্রহপত্র

এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় আসে দুবাইভিত্তিক অ্যাডসাম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এলএলসি। অরিজিনেটর ১২ আগস্ট বিএসইসিতে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেওয়ার একই দিনে প্রতিষ্ঠানটি আইসিবির কাছে একটি আগ্রহপত্র দেয়।

ওই আগ্রহপত্রে তিস্তা সোলার লিমিটেড এবং বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাচিত কিছু সম্পদে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বা অধিগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। তবে এটি ছিল প্রাথমিক আগ্রহপত্র, আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক কোনো চুক্তি নয়। প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই, দলিলপত্র, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্মতি এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পাওয়ার বিষয়গুলো বাকি ছিল।

আইসিবি সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির আগ্রহপত্রটি প্রয়োজনীয় নির্দেশনার জন্য বিএসইসিতে পাঠানো হয়। চিঠিতে আইসিবি স্পষ্ট করে যে, সুকুকের অন্তর্নিহিত সম্পদের ওপর সুকুকধারীদের অবিভক্ত মালিকানা স্বার্থ রয়েছে। ফলে এসব সম্পদ নিয়ে কোনো বিনিয়োগ বা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হলে বিদ্যমান ট্রাস্ট ডিড, চুক্তিপত্র, আইন ও বিধিবিধান এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে।

জবাবে বিএসইসি অ্যাডসাম ক্যাপিটালের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ রাখলেও শুধু এই প্রতিষ্ঠানের আগ্রহপত্রের মধ্যে প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ না রাখার পরামর্শ দেয়। অন্যান্য গ্রহণযোগ্য কৌশলগত ও আর্থিক বিনিয়োগকারীদেরও যাচাই করার কথা বলা হয়। প্রয়োজনে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত বিনিয়োগকারী নির্বাচন বা সম্পদ হস্তান্তরের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে বলা হয়।

এখানেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। সুকুকের সম্পদের মালিকানা ও বিনিয়োগকারীদের অধিকার নির্ধারিত থাকা অবস্থায় সম্পদ অধিগ্রহণের প্রস্তাব যাচাইয়ের ভিত্তি কী? আগ্রহপত্রদাতা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা কতটা যাচাই করা হয়েছে? সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জন্য স্বাধীন মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না? প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হলে অন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা সমান সুযোগ পাবেন কি না? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

অরিজিনেটরের আনুষ্ঠানিক আপত্তি

অ্যাডসাম ক্যাপিটালের আগ্রহপত্রের বিষয়ে আইসিবি ও বিএসইসির কার্যক্রমের পর অরিজিনেটর আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়। আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং ২১ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি ইতোমধ্যে পুনর্গঠন ও মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে। অরিজিনেটরও প্রস্তাবিত শর্ত মেনে নিয়েছে এবং ২০৩২ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন চেয়েছে।

এ অবস্থায় পুনর্গঠন প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে পৃথকভাবে সম্পদ অধিগ্রহণের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে প্রতিষ্ঠানটি।

অরিজিনেটরের বক্তব্য, সুকুকের অন্তর্নিহিত সম্পদ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ট্রাস্ট ডিড, সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং সব পক্ষের আইনগত অধিকার বিবেচনা করা জরুরি। অন্যথায় সম্পদের মালিকানা, আর্থিক দায় ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আইসিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাডসাম ক্যাপিটালের অনুরোধে গত ৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের দিন, অর্থাৎ ৭ অক্টোবর অরিজিনেটর আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়। সভায় বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয় এবং অ্যাডসাম ক্যাপিটালের প্রতিনিধিরা অসন্তোষ প্রকাশ করে সভা ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসপিভি গভর্নিং বোর্ডে আগ্রহপত্র, অরিজিনেটরের আপত্তি এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তিগত ও আইনগত বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়।

সম্পদের বিপরীতে জামানত নিয়েও বড় প্রশ্ন

সুকুকের সম্পদ অধিগ্রহণের আগ্রহপত্রের বাইরেও আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। সেটি হলো, সম্পদভিত্তিক বন্ড ইস্যু করা হলেও প্রকল্পের জমির বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করা নিয়ে জটিলতা।

গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সুকুকের আওতায় থাকা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি বন্ধক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেক্সিমকো তাতে সম্মতি দেয়নি। আইসিবি প্রায় ৬৫০ একর জমির মালিকানা যাচাই করে ১২৫ একরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে এবং এর মধ্যে ১০০ একর জমি বন্ধক দেওয়ার উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে।

কিন্তু বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে বন্ধক দলিল সম্পাদনে আপত্তি জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানের যুক্তি ছিল, বিদ্যমান ট্রাস্ট ডিডে অতিরিক্ত বন্ধক সৃষ্টির বিধান নেই। এ জন্য ট্রাস্ট ডিড সংশোধন, আইনি যাচাই, শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট করপোরেট বোর্ডের সম্মতি প্রয়োজন।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদভিত্তিক সুকুক ইস্যুর সময় সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা ও বন্ধকসংক্রান্ত বিষয়গুলো কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল? বিনিয়োগকারীদের অর্থের বিপরীতে সম্পদের আইনগত নিরাপত্তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে এমন বন্ডের ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ে? [ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিবি জমির বন্ধক নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিলেও তা সম্পন্ন হয়নি।]

প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তব বিনিয়োগে বড় পার্থক্য

সুকুকের অর্থ কোন প্রকল্পে কতটা ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিবির তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি প্রকল্পে প্রাথমিক বরাদ্দ ও প্রকৃত বিনিয়োগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়।

তিস্তা সোলার প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৮৮৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে ২ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, করতোয়া সোলার প্রকল্পে ৩০৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি টাকা। টেক্সটাইল বিভাগের সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৮০৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিনিয়োগ হয়েছে ৮০৬ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, করতোয়া প্রকল্পে পরিকল্পিত বিনিয়োগের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। বিপরীতে তিস্তা সোলার প্রকল্পে প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। কেন একটি প্রকল্পে বরাদ্দের তুলনায় বেশি এবং অন্যটিতে এত কম অর্থ বিনিয়োগ করা হলো, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সুকুকধারীদের ১ হাজার ৩০১ কোটি ৫২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। অরিজিনেটর থেকেও পর্যায়ক্রমিক মুনাফা হিসেবে ৩৬৩ কোটি টাকা এসেছে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর তিস্তা সোলারকে ৩৬৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং তহবিলে ৫০৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এসব অর্থের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়েও স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।

করতোয়া প্রকল্প অসম্পূর্ণ, অর্থ ফেরত নিয়ে শঙ্কা

সুকুকের অর্থে দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও করতোয়া সোলার প্রকল্প এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রকল্পটির একাংশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। প্রকল্পটি চালু করতে নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়েছে।

অন্যদিকে, বেক্সিমকোর টেক্সটাইল বিভাগের সম্প্রসারণ কার্যক্রমও আর্থিক ও পরিচালনাগত জটিলতায় পড়ে। ফলে সুকুকের অর্থে গড়ে তোলা তিনটি প্রকল্পের প্রত্যাশিত আয় থেকে বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৫ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুকুকের প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা মূলধন তখনো বকেয়া ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ৫ হাজার ৬০০ ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এই বন্ডে বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ব্যাংক ও ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের বিনিয়োগ রয়েছে।

ফলে মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী নয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদনেও বিএসইসির আপত্তি

বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকের আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা নিয়েও আগে প্রশ্ন তুলেছিল বিএসইসি। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এবং প্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য পর্যালোচনা করে একাধিক অসংগতি চিহ্নিত করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর একই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এম জে আবেদিন অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে নিরীক্ষা করানো হয়েছিল। অথচ বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ইস্যুয়ার কোম্পানি টানা তিন বছরের বেশি একই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিধিবদ্ধ নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে না বলে কমিশন উল্লেখ করেছিল।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুসরণের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তোলে বিএসইসি। বিশেষ করে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী আর্থিক দায়ের ঋণঝুঁকির পরিবর্তন যথাযথভাবে আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত না হওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়। এসব বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও নথিপত্র দিতে নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন।

এমনকি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বেক্সিমকোর সুকুক ইস্যু ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তার বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি বলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ, সুকুকের সম্পদ অধিগ্রহণের নতুন প্রস্তাব আসার আগেই এর আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ ছিল।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা

সব মিলিয়ে বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে নির্ধারিত সময়ে প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকার বকেয়া মূলধন ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে প্রকল্পের জমি বন্ধক, প্রকৃত বিনিয়োগের হিসাব, অসম্পূর্ণ প্রকল্প এবং আর্থিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ অধিগ্রহণের আগ্রহপত্র নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় অ্যাডসাম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এলএলসির প্রকৃত পরিচয়, আর্থিক সক্ষমতা, অর্থের উৎস, বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা এবং প্রস্তাবিত সম্পদের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে তার মূল্যায়ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হচ্ছে কি না, সব সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে সমান সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না এবং সুকুকধারীদের সম্মতি ও অধিকার যথাযথভাবে রক্ষা করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, পুনর্গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও ওয়ার্কিং কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিএসইসির অনুমোদন প্রক্রিয়াও দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। কারণ, এই সুকুকের সঙ্গে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং হাজারো বিনিয়োগকারীর স্বার্থ জড়িত।

অরিজিনেটরের একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যমান পুনর্গঠন ও মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে পৃথক কোনো অধিগ্রহণ প্রস্তাব নিয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। যেখানে সুকুকের বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন মুনাফার হার ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদ অধিগ্রহণের আলোচনা কেন অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

এখন দেখার বিষয়, বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইসিবি ও বিএসইসি পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে কত দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে, নাকি সম্পদ অধিগ্রহণের নতুন প্রস্তাব ঘিরে পুরো প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে।

সর্বশেষ