খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কারসাজিতে দুই কোটি টাকা জরিমানার পর এবার আজাদ হোসেন পাটোয়ারী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হিসাবের অর্থের উৎস অনুসন্ধানে নেমেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিটি পুনর্গঠন করেছে কমিশন।
গত রোববার (১ নভেম্বর) এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়। কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, আজাদ হোসেন পাটোয়ারী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক, স্টক ডিলার ও স্টক ব্রোকার প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হিসাবের লেনদেন খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য জমা হওয়া অর্থের উৎস, ব্যাংক থেকে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর এবং অর্থের প্রকৃত ব্যবহার অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে।
বিএফআইইউর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সন্দেহজনক লেনদেন
বিএফআইইউর বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আজাদ হোসেন পাটোয়ারী ও তাঁর সহযোগীদের বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের হিসাবের আর্থিক লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব হিসাবের দৈবচয়নভিত্তিক পর্যালোচনায় সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় ইনসাইডার ট্রেডিং ও মার্কেট ম্যানিপুলেশন-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় বিএফআইইউ।
নতুন অনুসন্ধানে শুধু অর্থের উৎস নয়, অর্থ কীভাবে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং পুঁজিবাজারে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।
৭টি বিও হিসাবে ৮ কোটি ২১ লাখ টাকা মুনাফা
খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার নিয়ে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত সময়ে সংঘবদ্ধ কারসাজির অভিযোগে বিএসইসির তদন্তে আজাদ হোসেন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়।
কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী, ওই সময়ে তিনি সাতটি বিও হিসাবের মাধ্যমে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৯টি শেয়ার লেনদেন করেন। এসব লেনদেন থেকে তাঁর ৮ কোটি ২১ লাখ ৩ হাজার ৩১০ টাকা রিয়েলাইজড ক্যাপিটাল গেইন বা বিক্রি করে অর্জিত মুনাফা হয়।
এ ছাড়া তদন্তকালীন তাঁর হাতে থাকা অবিক্রীত শেয়ারে ১৩ কোটি ৬৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৬ টাকা আনরিয়েলাইজড ক্যাপিটাল গেইন বা কাগুজে মুনাফা ছিল।
শেয়ার কারসাজির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিএসইসি তাঁকে দুই কোটি টাকা জরিমানা করে।
একাধিক বিও হিসাব ব্যবহার করে কৃত্রিম লেনদেন
বিএসইসির তদন্তে আজাদ হোসেন পাটোয়ারী ছাড়াও মো. নাসির উদ্দিন আকন ও মো. আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে খান ব্রাদার্সের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির প্রমাণ পাওয়া যায়।
তদন্তে উঠে আসে, বিভিন্ন বিও হিসাব ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে শেয়ার হাতবদল এবং আগ্রাসীভাবে বেশি দামে শেয়ার কেনার মাধ্যমে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ও লেনদেনকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম সক্রিয়তা তৈরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এ ঘটনায় বিএসইসি আজাদ হোসেন পাটোয়ারীকে দুই কোটি টাকা, নাসির উদ্দিন আকনকে এক কোটি টাকা এবং আখতার হোসেনকে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা জরিমানা করে। তিনজনের মোট জরিমানার পরিমাণ ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
নতুন অনুসন্ধান কমিটিতে তিন কর্মকর্তা
বিএসইসির পুনর্গঠিত অনুসন্ধান কমিটিতে রয়েছেন:
অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ রাকিবুর রহমান
যুগ্ম পরিচালক মো. শাহনওয়াজ
সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান
কমিশনের আদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২১ ধারা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ১৭(ক) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫)-এর বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা আগের অনুসন্ধান আদেশের ভিত্তিতে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সংশোধিত কার্যপরিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা সংশ্লিষ্ট আরেকটি আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
আগের কারসাজির ঘটনাও আলোচনায়
খান ব্রাদার্সের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় এর আগেও বিএসইসি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। ২০২৩ সালের ৫ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়ানোর অভিযোগে বিকন গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসহ ছয় পক্ষকে মোট ৩৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪-২৫ সালের আরেকটি কারসাজির ঘটনায় আট ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮৬ লাখ টাকা জরিমানার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ঘটনায় আজাদ হোসেন পাটোয়ারীসহ কয়েকজনের নাম উঠে আসে।
সাম্প্রতিক জরিমানা ও নতুন মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান পুঁজিবাজারে কারসাজির অর্থায়ন, সংশ্লিষ্ট হিসাবের স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধান এখনো চলমান। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থপাচারের অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।























