ঢাকা   শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

তরঙ্গের দাম আরও কমানোর দাবি অপারেটরদের, রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় সরকার

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১১:৩৮, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

তরঙ্গের দাম আরও কমানোর দাবি অপারেটরদের, রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় সরকার

মুঠোফোনে কথা বলা, ইন্টারনেটে ভিডিও দেখা কিংবা কাজের প্রয়োজনে অনলাইনে যুক্ত থাকা—সবকিছুর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গ। এই তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি নবায়নে কত টাকা দিতে হবে, তা নিয়ে এখন চলছে আলোচনা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আগের নির্ধারিত দরের তুলনায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে তরঙ্গ নবায়ন ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে অপারেটরদের দাবি, প্রস্তাবিত দামও বেশি। তাঁরা আরও কম মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ চান।

তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানো বা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু মোবাইল অপারেটরদের ব্যয়ের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবার মান উন্নয়ন এবং সরকারের রাজস্ব আয়। অপারেটরদের যুক্তি, তরঙ্গের খরচ কমলে নেটওয়ার্ক উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন সুবিধার সুফল গ্রাহকেরা কতটা পেয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে তরঙ্গের দাম কমলে গ্রাহকের ইন্টারনেট বা কলের খরচ কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্রযুক্তি নীতিমালা পরামর্শক আবু নাজম মো. তানভীর হোসেন বলেন, তরঙ্গের দাম ৩০ শতাংশ কমানো হলে সেবার মান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাও সে অনুযায়ী বাড়ানো উচিত। এ ক্ষেত্রে কোয়ালিটি অব সার্ভিসের (কিউওএস) মানদণ্ড বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কঠোর করতে হবে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর মতে, এমন মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে অপারেটরদের ব্যবসা টেকসই হয় এবং গ্রাহকেরা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত সেবা পান। এ দায়িত্ব বিটিআরসিকেই পালন করতে হবে।

কোন তরঙ্গের কী কাজ

মুঠোফোন সেবায় ব্যবহৃত সব তরঙ্গের কাজ এক নয়। যেমন ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড তুলনামূলক বিস্তৃত এলাকায় নেটওয়ার্কের আওতা তৈরি এবং ঘরের ভেতরে সংযোগ পৌঁছাতে বেশি কার্যকর। ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে নেটওয়ার্কের আওতা ও ধারণক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড মূলত নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং ডেটা সেবার চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।

বেতার তরঙ্গ একটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই এটি ব্যবহারের অনুমতি পেতে অপারেটরদের সরকারকে নির্ধারিত ফি দিতে হয়। এই ব্যয়ের বাইরে টাওয়ার স্থাপন, যন্ত্রপাতি কেনা, বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মতো খরচও রয়েছে।

অপারেটরদের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তরঙ্গের দাম বেশি হলে বা নবায়ন ব্যয় বেড়ে গেলে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। বিপরীতে, তরঙ্গের খরচ কমানো হলে সেই অর্থের একটি অংশ নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানো, ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হতে পারে।

নবায়নে ব্যয় কমছে ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা

বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা ৯০০, ১ হাজার ৮০০ ও ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। এসব তরঙ্গ ব্যবহারের বিদ্যমান লাইসেন্সের মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হবে। তিন অপারেটরের হাতে মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবির ২২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংকের ২৪ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ।

বর্তমান নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এসব তরঙ্গ নবায়নে ব্যয় হওয়ার কথা ১৬ হাজার ৮৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে বিটিআরসির নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১৩ হাজার ১০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাবটি কার্যকর হলে আগের হিসাবের তুলনায় সরকারের সম্ভাব্য আয় কমবে ৩ হাজার ৭৪৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

গত ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিটিআরসি। এ ছাড়া আগে তরঙ্গ নবায়নের মেয়াদ ১২ বছর ৪ মাস রাখার প্রস্তাব করা হলেও এবার তা বাড়িয়ে ২০ বছর করার কথা বলেছে কমিশন।

বিটিআরসি জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গবেষণা করে তরঙ্গ নবায়নের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চারটি পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো আয় ও নগদ অর্থপ্রবাহের হিসাব, টাওয়ারের খরচ সাশ্রয়ের প্রকৌশলভিত্তিক মডেল, বিভিন্ন দেশের তরঙ্গের দামের তুলনা এবং আর্থসামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ।

অপারেটররা আরও কম দাম চায় কেন

বিটিআরসির প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও তরঙ্গের দাম আরও কমানোর দাবি জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি।

চিঠিতে অ্যামটবের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার তরঙ্গ নবায়নের অর্থ ২০ বছরে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছেন। পাশাপাশি বার্ষিক তরঙ্গ চার্জ প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অ্যামটবের যুক্তি, দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি দামের হিসাব সরাসরি দীর্ঘ সময়ের ওপর প্রয়োগ করা যৌক্তিক নয়। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের আয়-ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং বিনিয়োগের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সংগঠনটির হিসাবে, বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটররা তাদের আয়ের ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ তরঙ্গের পেছনে ব্যয় করে। বিশ্বে এ হার গড়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

গ্রাহকের কী লাভ হবে

বিটিআরসির হিসাবে, দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৯ কোটির বেশি। অপারেটরদের দাবি, তরঙ্গের দাম কমানো হলে তাদের নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়বে। এতে সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নেটওয়ার্কের আওতাও সম্প্রসারিত হতে পারে।

তবে তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানোর সুফল শেষ পর্যন্ত গ্রাহকেরা কীভাবে পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার পরও অপারেটররা গ্রাহকদের জন্য সেবার মান বা মূল্য কতটা উন্নত করেছে, তা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাই শুধু ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করলেই গ্রাহক উপকৃত হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ বিষয়ে অ্যামটবের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, তরঙ্গের দাম কমানো হলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। এতে অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে এবং নেটওয়ার্কের আওতা আরও সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে দেশের মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

তবে এ সুফল নিশ্চিত করতে তরঙ্গের দাম কমানোর পাশাপাশি অপারেটরদের সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর শর্ত আরোপ এবং তা নিয়মিত তদারকির প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় ব্যয় কমানোর সুবিধা অপারেটরদের ব্যবসায়িক লাভ বাড়ালেও গ্রাহকেরা প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

সরকারের চিন্তা রাজস্ব নিয়ে

তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানোর প্রস্তাবের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টিও যুক্ত। প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় অর্থ বিভাগ।

নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে ৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এর মধ্যে বিটিআরসির মাধ্যমে ৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়ন ফিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তরঙ্গ নবায়ন মূল্য কমানো হলে সরকারের সম্ভাব্য আয় কমতে পারে। সরকারের বিভিন্ন খাত থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা থাকে। ফলে একটি খাতের আয় কমলে সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই সব দিক বিবেচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে তরঙ্গ নবায়নের মূল্য নির্ধারণে একদিকে অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সরকারের রাজস্ব স্বার্থ। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে শুধু ফি কমানো নয়, বরং সেই সুবিধার বিনিময়ে অপারেটরদের কাছ থেকে কী পরিমাণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সেবার মান নিশ্চিত করা যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ