ঢাকা   শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নজর ব্যাংকগুলোর, খুলছে বিশেষায়িত ডেস্ক

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০৯:৪৫, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নজর ব্যাংকগুলোর, খুলছে বিশেষায়িত ডেস্ক

বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ছে। দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ায় তাদের ব্যাংকিং সেবার চাহিদাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে চীনা ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বিশেষায়িত সেবা দিতে দেশের ব্যাংকগুলো চালু করছে ‘চায়না ডেস্ক’। ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি ১৪টি ব্যাংক এ সেবা চালু করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক চীনে প্রতিনিধি অফিসও খুলেছে।

চায়না ডেস্কে চীনা ভাষা মান্দারিন জানা কর্মকর্তা এবং চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এসব ডেস্ক থেকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন, প্রকল্পের হিসাব খোলা, প্রকল্প অর্থায়ন, ব্যাংক গ্যারান্টি, বাণিজ্য অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হচ্ছে।

সর্বশেষ চায়না ডেস্ক চালু করেছে ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক। এর আগে এ সেবা চালু করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ, এইচএসবিসি বাংলাদেশ, ব্যাংক অব সিলন, হাবিব ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), প্রাইম ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, চায়না ডেস্কের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগকারী, বাংলাদেশি আমদানিকারক-রপ্তানিকারক এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে আর্থিক সংযোগ বাড়ছে। এসব ডেস্ক থেকে বাণিজ্য অর্থায়ন, নগদ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও প্রকল্প অর্থায়নসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য বাড়ছে

বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী, সৌর ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম, প্রযুক্তিপণ্য, তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন থেকে। বৈদ্যুতিক ও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও দেশটির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো চীনের ব্যাংক অব চায়না, আইসিবিসি, সিসিবি ও এবিসির মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন এবং নস্ট্রো হিসাব পরিচালনা করছে।

চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাণিজ্য বেড়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে চীন থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার ১০ শতাংশও দেশটিতে রপ্তানি করতে পারে না। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বড় ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে তোলা হয়েছে চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের পর থেকে চীনের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ১০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

চীনা বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকিং চাহিদা বাড়ছে

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আগে চীন থেকে শুধু আমদানি হতো, এখন দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ কারণে তাদের ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের ব্যাংকগুলো চায়না ডেস্ক খুলছে।

ব্যাংকভেদে বিশেষায়িত সেবা

চীনা ব্যবসায়ীদের সেবা দিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০১৬ সালে ‘চায়না ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ চালু করে। ২০২১ সালে এ সেবা আরও জোরদার করা হয়। ব্যাংকটি চীনা নাগরিকদের নিয়োগের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সিন্ডিকেট অর্থায়নও শুরু করে।

প্রিমিয়ার ব্যাংক ২০১২ সালে এবং এমটিবি ২০১৮ সাল থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য বা এফডিআই হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে চীনা ব্যবসায়ীদের সেবা দিয়ে আসছে।

ইস্টার্ন ব্যাংক ২০১৯ সালে চীনের গুয়াংজুতে নিজস্ব প্রতিনিধি অফিস চালু করে। ২০২৩ সালে ঢাকায় চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য পৃথক বিজনেস ডেস্ক খোলে। একই বছর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক চীনা নাগরিকদের জন্য বিশেষ সেবা কাউন্টার চালু করে। প্রাইম ব্যাংক ও এইচএসবিসি বাংলাদেশও ২০১৯ সালে চায়না ডেস্ক চালু করে।

বহুজাতিক হাবিব ব্যাংক ২০২০ সালে এবং স্থানীয় দ্য সিটি ব্যাংক ২০২২ সালে এ সেবা শুরু করে। সম্প্রতি সিটি ব্যাংক তাদের সেবা সম্প্রসারণ করেছে। শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন ২০২৩ সালে চীন ও ইউয়ান মুদ্রাকেন্দ্রিক বিশেষ সেবা চালু করে।

ব্র্যাক ব্যাংক ২০২৪ সালে করপোরেট ব্যাংকিংয়ের আওতায় মান্দারিন জানা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চায়না ডেডিকেটেড ডেস্ক চালু করে। মিডল্যান্ড ব্যাংক ২০২৫ সালে চায়না ডেস্ক খোলে। চলতি বছর ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক এ সেবা চালু করেছে।

ওয়ান ব্যাংক ইতিমধ্যে চায়না ডেস্কের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি ডলারের লেনদেন করেছে।

ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল করিডর কৌশলের অংশ হিসেবে চলতি বছর আমরা চায়না ডেস্ক চালু করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ আরও জোরদার করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমন্বিত ও সহজতর ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর শিল্প, উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী খাতের বিকাশে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন করেছি। এখন আরও কিছু চীনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে কাজ করছি।’

বাংলাদেশে চীনা কোম্পানির বিস্তৃত কার্যক্রম

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্য খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে বড় পরিসরে কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যাংকগুলোয় হিসাব পরিচালনা করছে, আমানত রাখছে, বিনিয়োগ আনছে এবং ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা নিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিভিন্ন প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও প্রকৌশলগত কাজ করছে বেশ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং, জিয়াংসু ইটার্ন, ফুজিয়ান ইলেকট্রিক পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না ওয়ানবাও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি, নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল, সানসিংস স্মার্ট ইলেকট্রিক বাংলাদেশ কোম্পানি ও হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি।

বৃহৎ অবকাঠামো, সড়ক, সেতু, রেলপথ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিমানবন্দর নির্মাণেও যুক্ত চীনা কোম্পানিগুলো। এ তালিকায় রয়েছে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, চায়না কনস্ট্রাকশন সেভেনথ ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি, সিআরসিসি হারবার, পাওয়ার চায়না হুপেই কনস্ট্রাকশন, চায়না রেলওয়ে ব্রিজ গ্রুপ, জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রেলওয়ে ১৬তম ব্যুরো গ্রুপ করপোরেশন, চায়না শানডং ইন্টারন্যাশনাল, সিনোহাইড্রো, বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ, চায়না শানডং হাই-স্পিড কিয়ানফাং ইন্টারন্যাশনাল টেকনোলজি, পাওয়ার চায়না হারবার কোম্পানি, হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, টিবিইএ কোম্পানি ও চায়না হেবেই কনস্ট্রাকশন।

এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে বৈদ্যুতিক ও বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ করছে সানি ট্রেন্ড (এইচকে) কোম্পানি, জিউনুও (বাংলাদেশ) ম্যাটেরিয়ালস কোম্পানি, হেংচেন জিয়াসেং ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি এবং অ্যাডেলিন বিউটি টেকনোলজি (বাংলাদেশ) কোম্পানি।

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিস্তৃত কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তাদের জন্য বিশেষায়িত সেবার গুরুত্ব বাড়ছে। চায়না ডেস্কগুলো দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের আর্থিক সংযোগ আরও সহজ করতে ভূমিকা রাখছে।

সর্বশেষ