মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বাড়ে। এতে গত এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে তেলের দর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা নতুন করে জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বাজারের ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে।
শুক্রবার মেয়াদ শেষ হওয়া ব্রেন্ট ক্রুডের ডিসেম্বরের ফিউচার চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলার ৭৬ সেন্ট বা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১১৭ ডলার ৬৪ সেন্টে দাঁড়ায়। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১১৮ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। তুলনামূলক বেশি লেনদেন হওয়া জানুয়ারির চুক্তির দাম ২ ডলার ৬৩ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলার ৪৩ সেন্টে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের ফিউচার চুক্তির দাম ২ ডলার ১২ সেন্ট বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ১২ সেন্ট হয়েছে।
পুরো অক্টোবর মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বিওকে ফাইন্যান্সিয়ালের ট্রেডিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিস কিসলার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনীর সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতা নিয়ে ব্যবসায়ীরা নজর রাখবেন।’
হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা
তেলের বাজারে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা। শুক্রবার ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, একটি ছোট নৌযান থেকে লাগানো বিস্ফোরক ডিভাইসের আঘাতে ট্যাংকারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ হামলার পেছনে কারা রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। ফলে এই পথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সামুদ্রিক খাতের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর এই জলপথে ছোট নৌযান থেকে জাহাজের গায়ে লাগানো বিস্ফোরক বা লিমপেট মাইন ব্যবহার করে এটিই প্রথম সফল হামলার ঘটনা।
সৌদি আরবেও নিরাপত্তা উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি আরব থেকে জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৩ অক্টোবর থেকে এ নির্দেশ কার্যকর হয়েছে বলে শুক্রবার রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে।
বেসামরিক বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হুতি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি করে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে দেশটির বড় তেল শোধনাগার রাস তানুরা ও রাবিগ এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর আবকাইক উৎপাদন স্থাপনা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার চেষ্টা
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শুক্রবার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে ফিরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেন, ইরানকে চিকিৎসাসামগ্রী পেতে সহায়তা করার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে ভ্যান্স ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ভ্যান্সের চিঠি পেয়েছে তেহরান। তবে এখনো কোনো জবাব দেয়নি দেশটি। ইরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের শর্ত মেনে নিতে হবে। এসব শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেকোনো অবস্থান অগ্রহণযোগ্য।
সামনে আরও অস্থির হতে পারে তেলের বাজার
ডেনমার্কভিত্তিক স্যাক্সো ব্যাংকের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগামী কয়েক সপ্তাহে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
ব্যাংকটির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শেষ হলেও অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ ডলারের উচ্চতর সীমায় থাকতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল ৬০ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে চাপে রেখেছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের গতিপথ।
























