বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও একা বিদেশযাত্রার সময় অনেক নারীকে ইমিগ্রেশনে শুনতে হয় নানা ব্যক্তিগত প্রশ্ন—কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, স্বামী জানেন কি না, অভিভাবক সঙ্গে নেই কেন। কখনো স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে কর্মকর্তারা সরাসরি ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীকেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সম্প্রতি নেপাল যাওয়ার পথে তিন প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত নারীকে ইমিগ্রেশন থেকে আটকে দেওয়ার অভিযোগ আদালতে গড়ানোর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁদের দাবি, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কোনো লিখিত কারণ বা আইনগত ভিত্তি না দেখিয়ে তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়।
নেপাল যাওয়ার পথে তিন নারীকে কেন থামানো হলো?
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নওগাঁর ওই তিন নারী ৮ আগস্ট সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। তাঁদের ফ্লাইট ছিল সকাল ১০টা ৫ মিনিটে। রিট আবেদনে তাঁরা জানান, তিনজনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং ভ্রমণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টিকিট তাঁদের কাছে ছিল।
তাঁদের অভিযোগ, ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ তাঁদের বিদেশযাত্রার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় কোনো লিখিত নোটিশ বা নির্দিষ্ট আইনগত কারণও জানানো হয়নি বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁদের দাবি, বিদেশযাত্রায় আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা কিংবা অন্য কোনো আইনগত বাধা ছিল না। একজন নারী অবিবাহিত কি না, তাঁর সঙ্গে মা-বাবা বা অভিভাবক আছেন কি না—এসব বিষয়কে বৈধ ভ্রমণ ঠেকানোর স্বতন্ত্র কারণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিই এখন আদালতের বিবেচ্য বিষয়।
তিন নারীর রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ কিংবা লিঙ্গভিত্তিক অন্য কোনো বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছেন।
রিটের পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কেন ওই নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হলো, সেটিই মূল প্রশ্ন। তাঁর মতে, এ ধরনের আচরণ সংবিধানের সমতা, বৈষম্যবিরোধী নিশ্চয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও চলাফেরার স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্ন তৈরি করে।
মানব পাচার ঠেকাতে বাড়তি নজরদারি
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের রুট হিসেবে নেপাল ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে নেপালে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ থাকায় বিমানবন্দরে যাত্রীদের কাগজপত্র যাচাইয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কোনো যাত্রীর কাগজপত্র বা ভ্রমণের উদ্দেশ্য সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁদের দাবি, নেপালে সেমিনারে যাওয়ার কথা বলা হলেও ওই তিন নারী আমন্ত্রণপত্র দেখাতে পারেননি।
তবে পুলিশের সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে মন্তব্য করা হচ্ছে না।
একা নারী মানেই কেন বাড়তি সন্দেহ?
তিন নারীর ঘটনা সামনে আসার পর একা বিদেশযাত্রায় ইমিগ্রেশনে হয়রানি বা অতিরিক্ত প্রশ্নের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও কয়েকজন নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন।
জেন্ডার বিশ্লেষক সাবিনা পারভীন তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, গত বছরের নভেম্বরে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নেপাল যাওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা ৫২ বছর বয়সী এক নারীকে ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ওই পরিবারের সদস্য না হওয়ায় কর্মকর্তারা তাঁকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন বলে তাঁর ভাষ্য।
দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই নারীকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। সাবিনা পারভীনের মতে, নারী একা ভ্রমণ করলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা এখনো রয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী। তাঁর ভাষ্য, কয়েক বছর আগে পাঁচ নারী একটি কর্মশালায় অংশ নিতে নেপাল যাচ্ছিলেন। সবার কাছে আমন্ত্রণপত্র থাকলেও তাঁদের একজনকে ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওই নারীকে প্রশ্ন করা হয়, সাত দিনের জন্য নেপাল যাওয়ার বিষয়টি তাঁর স্বামী জানেন কি না। পরে তাঁর কাছ থেকে স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে ফেরদৌস আরা জানান।
তাঁর নিজেরও একা বিদেশ যাওয়ার সময় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, একবার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা পাসপোর্টে সিল দেওয়ার সময় তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন—স্বামীকে সঙ্গে নেননি কেন।
সাংবাদিক পরিচয় ও আগের ভ্রমণও সবসময় যথেষ্ট নয়
এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এক নারী সাংবাদিকও। তাঁর পাসপোর্টে সাংবাদিকতা পেশা, বিবাহিত হওয়ার তথ্য এবং আগের বিদেশভ্রমণের রেকর্ড থাকার পরও প্রায় ১৪ বছর আগে আবুধাবি যাওয়ার সময় তাঁকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ভ্রমণের টিকিট নিয়ে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাচ্ছিলেন। সেখানে আত্মীয়ের বাসায় থাকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তাঁর ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন এবং শেষ পর্যন্ত আবুধাবিতে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চান।
সময়ের পার্থক্যের কারণে তখন সেখানে রাত প্রায় তিনটা। তবু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত আত্মীয়কে ফোন করে কথা বলিয়ে দিতে হয়। পরে অবশ্য ওই নারী বিদেশযাত্রার অনুমতি পান।
যাচাই প্রয়োজন, তবে জবাবদিহিও জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, তিন নারীকে কেন বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি, তার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, কোন পরিস্থিতিতে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়েছিল, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সেটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। যদি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ না থাকে, তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে যদি দায়িত্বে গাফিলতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
মানব পাচার প্রতিরোধে বিমানবন্দরে যাত্রীদের যাচাই-বাছাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই যাচাইয়ের পদ্ধতি কতটা আইনভিত্তিক, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন—নেপালগামী তিন নারীর ঘটনায় সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। আদালতের রুলের পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
























