ফ্রান্সে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালি রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দলটির নেত্রী মেরিন লো পেনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা জোরালো হয়েছে। তবে আগামী নির্বাচনে ফ্রান্সের ক্ষমতায় কারা আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ফ্রান্সের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ২০ অক্টোবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন ক্যাটরিন বেনহোল্ড। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, প্রায় এক দশক আগে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মাখোঁ এখন দেশের অর্থনৈতিক সংকট, জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক বিভাজনের মুখে পড়েছেন।
২০১৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাখোঁ। তখন তাঁর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া। কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান ঠেকানো এবং বাম ও ডানপন্থী রাজনীতির বিভাজন কমানোর কথাও বলেছিলেন তিনি।
কিন্তু প্রায় এক দশক পর ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। মাখোঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কার হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ঋণ ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
বিক্ষোভের মধ্যে সরকারের ওপর চাপ
ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে চলতি মাসের শুরুতে হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সরকারি সেবার অব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
ক্যাটরিন বেনহোল্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় মাখোঁ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিলেন বলে সমালোচনা তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় আন্দোলন করছিল, তখন তিনি ব্রিটানির উপকূলের কাছে একটি যুদ্ধজাহাজে সময় কাটাচ্ছিলেন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব তখন সরকারের অন্য নেতাদের ওপর পড়ে।
পরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, লুটপাট, গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিক্ষোভ ও সহিংসতার আগে মাখোঁর প্রতি জনসমর্থন মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল নিয়েও রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়।
তবে ফ্রান্সে রাজপথের আন্দোলন নতুন ঘটনা নয়। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সরকারি নীতির প্রতিবাদে আন্দোলন করেছেন। এবারের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি শিক্ষা ও সরকারি সেবার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারেও কমেনি অসন্তোষ
মাখোঁর অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। এ জন্য তাঁর সরকার করপোরেট কর ও আয়কর কমিয়েছে। সম্পদের ওপর আরোপিত করব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি ছিল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর করের চাপ কমলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতির গতি বাড়ানো সম্ভব হবে।
কিন্তু এসব সংস্কারের পরও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। সরকারি ঋণের চাপ বেড়েছে, আর্থিক ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
করছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সামলানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য ফ্রান্সের সব অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য মাখোঁর নীতিকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। তাঁর ক্ষমতায় আসার আগেও দেশটিতে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির মতো বৈশ্বিক ঘটনাও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়ায় সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ বেড়েছে। আর এই অসন্তোষই ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ক্ষেত্র তৈরি করছে।
নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় লো পেনের দল
মাখোঁ সরকারের ওপর চাপ বাড়ার মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে মেরিন লো পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি। দলটির নেতারা দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারের ব্যর্থতার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে বক্তব্য দিচ্ছেন।
দলটির সভাপতি জর্ডান বারদেলা বলেন, মানুষের এখন জেগে ওঠা দরকার এবং সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাঁদের দল প্রস্তুত বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, এক ভিডিও বার্তায় লো পেন ফ্রান্সকে বিভক্ত একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরেন। ভিডিওতে ফ্রান্সের পতাকার সামনে বসে তিনি বক্তব্য দেন। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মাখোঁর সরকার ও কট্টর বামপন্থীদের মধ্যে বিক্ষোভের দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সুযোগে ন্যাশনাল র্যালি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, জননিরাপত্তা ও সামাজিক বিভাজনের বিষয়গুলোকে সামনে রেখে দলটি ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে বিক্ষোভের কারণে লো পেনের দল কতটা অতিরিক্ত সমর্থন পাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য নীতিগত বিষয়েও।
মাখোঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর মাখোঁকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। দুজনের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন ও আশার বার্তা দিয়ে রাজনীতিতে নতুন ধারা আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
কিন্তু মাখোঁর ক্ষেত্রেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তাঁর সমালোচকদের মতে, তিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে দূরে থাকা একজন অভিজাত রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।
মাখোঁর শাসনামলের মূল্যায়ন শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে না। তাঁর বিদায়ের পর ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক সংকট ও জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ন্যাশনাল র্যালি কি ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে? নাকি অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হবে?
ফ্রান্সের পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায় নির্ধারণে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান বিক্ষোভ ও সরকারের প্রতি অসন্তোষকে সরাসরি কট্টর ডানপন্থীদের নির্বাচনী বিজয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
























