ঢাকা   মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

আয় বাড়লেও ডিভিডেন্ড নিয়ে সংশয়, নগদ প্রবাহে দুর্বলতা কেপিসিএলের

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১২, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

আয় বাড়লেও ডিভিডেন্ড নিয়ে সংশয়, নগদ প্রবাহে দুর্বলতা কেপিসিএলের

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা ও সম্পদমূল্য বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৬২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বেড়েছে ৫৮ পয়সা। তবে আর্থিক সূচকের এই উন্নতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়েনি পরিচালন কার্যক্রমের নগদ প্রবাহ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির পাওনা সময়মতো আদায় না হওয়ায় কোম্পানিটির নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ রয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আগের বছরের ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

কোম্পানির প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৭৩ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ১৩ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৬০ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪৬১ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

কেপিসিএলের আয়ের পেছনে কয়েকটি বিষয় ভূমিকা রেখেছে। অর্থায়ন আয় ও অন্যান্য আয় বেড়েছে। পাশাপাশি বিক্রয় ব্যয় এবং অর্থায়ন ব্যয় কমেছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় কোম্পানিটির অংশ বৃদ্ধি পাওয়াও আয়ের উন্নতিতে অবদান রেখেছে।

তিন প্রান্তিকেই আয় বেড়েছে

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের প্রতিটিতেই আগের বছরের তুলনায় বেশি শেয়ারপ্রতি আয় করেছে কেপিসিএল। ফলে নয় মাসের প্রবৃদ্ধি কোনো একক প্রান্তিকের ভালো ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল নয়।

২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২৫ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে তা ছিল ৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে আয় বেড়েছে ২১ পয়সা বা ৫২৫ শতাংশ। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় অংশ বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন আয় বাড়ার কারণে এই উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

দ্বিতীয় প্রান্তিকেও আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়ায় ২৭ পয়সায়। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৪ পয়সা। এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩ পয়সা বা ৫৭৫ শতাংশ। এ সময় সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় অংশ ও অর্থায়ন আয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন ব্যয় কমে আসা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ২২ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে তা ছিল ৫ পয়সা। ফলে তৃতীয় প্রান্তিকে আয় বেড়েছে ১৭ পয়সা বা ৩৪০ শতাংশ। অর্থায়ন ও অন্যান্য আয় বৃদ্ধি এবং বিক্রয় ও অর্থায়ন ব্যয় হ্রাসের কারণে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন প্রান্তিকের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কেপিসিএলের আয় বৃদ্ধির ধারা ধারাবাহিক ছিল। তবে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকেও এই প্রবণতা বজায় থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মুনাফা এবং অর্থায়ন ও অন্যান্য আয় থেকে পাওয়া সুবিধা ভবিষ্যতে একই মাত্রায় অব্যাহত থাকবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সম্পদমূল্য বেড়েছে, কিন্তু নগদ অর্থের চিত্র ভিন্ন

আয়ের পাশাপাশি কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন এই মূল্য ছিল ১৯ টাকা ৩ পয়সা। ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ১৯ টাকা ২৭ পয়সা হয়। এরপর ৩১ ডিসেম্বর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়ায় ১৯ টাকা ৩৯ পয়সায়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তা আরও বেড়ে ১৯ টাকা ৬১ পয়সায় পৌঁছায়।

এ হিসাবে নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ৫৮ পয়সা বা প্রায় ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার বিচারে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে সম্পদমূল্য বৃদ্ধি এবং হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ এক বিষয় নয়। হিসাবের খাতায় সম্পদের মূল্য বাড়লেও সেই সম্পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পাওয়া যায় না। তাই লভ্যাংশ দেওয়ার সামর্থ্য বুঝতে সম্পদমূল্যের পাশাপাশি নগদ অর্থের প্রবাহ ও প্রাপ্য অর্থ আদায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।

পরিচালন নগদ প্রবাহে কেন চাপ?

কেপিসিএলের আর্থিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের জায়গা হলো পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ। প্রথম প্রান্তিকে ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ৫ পয়সা। অর্থাৎ ওই প্রান্তিকে নগদ প্রবাহের ঘাটতি কিছুটা কমেছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ের সম্মিলিত হিসাব ভিন্ন চিত্র দেখায়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ইতিবাচক ৮০ পয়সা।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে এই সূচক দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ পয়সায়। আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ইতিবাচক ৮১ পয়সা। অর্থাৎ আয় বাড়লেও দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ আসার পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিপিডিবির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে পাওনা অর্থ আদায় না হওয়াই এর প্রধান কারণ। বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয় হিসাবভুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট অর্থ হাতে না এলে নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে নিয়মিত পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানোর ক্ষেত্রে চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

ডিভিডেন্ড বাড়ানোর পথে বাধা কোথায়?

কোম্পানির আয় ও সম্পদমূল্য বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেশি ডিভিডেন্ড পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। কেপিসিএলের ক্ষেত্রেও প্রথম নয় মাসের আয় বৃদ্ধির তথ্য সেই প্রত্যাশাকে জোরালো করতে পারে। কিন্তু লভ্যাংশের সিদ্ধান্ত শুধু মুনাফার অঙ্কের ওপর নির্ভর করে না। কোম্পানির হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক দায় মেটানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেপিসিএল স্পনসর ও পরিচালক ছাড়া সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেছিল। এবার সেই হার বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে পূর্ণ বছরের আর্থিক ফলাফল এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর।

একদিকে, প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় ১৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৭৩ পয়সায় পৌঁছেছে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকেও আয় ভালো থাকলে এবং নিরীক্ষিত হিসাবে পর্যাপ্ত মুনাফা ও বিতরণযোগ্য অর্থ পাওয়া গেলে আগের বছরের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, পরিচালন নগদ প্রবাহের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে আয় বৃদ্ধির পুরো সুবিধা লভ্যাংশে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। বিপিডিবির কাছে পাওনা অর্থ আদায়ে বিলম্ব চলতে থাকলে কোম্পানিকে নগদ অর্থ সংরক্ষণ এবং অন্যান্য আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগের বছরের ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্তও আসতে পারে।

আয়ের প্রবৃদ্ধি কি ভবিষ্যতেও থাকবে?

কেপিসিএলের আয়ের উন্নতিতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় অংশ বৃদ্ধি, অর্থায়ন আয় বাড়া এবং বিভিন্ন ব্যয় কমে আসার ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব উৎস থেকে পাওয়া সুবিধা আগামী দিনেও একই হারে বজায় থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ কারণে প্রথম নয় মাসের প্রায় ৪৬২ শতাংশ আয় বৃদ্ধিকে সরাসরি পুরো বছরের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। একইভাবে, আয় বেড়েছে বলেই ডিভিডেন্ডও সমানুপাতিক হারে বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত হিসাব, নগদ প্রবাহ এবং কোম্পানির আর্থিক দায়ের পরিমাণ একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

২৮ অক্টোবর পর্ষদ সভা

কেপিসিএল জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে আগামী ২৮ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার বিকেল ৪টায় পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কত শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে, তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই পর্ষদ সভায় বিবেচিত আর্থিক ফলাফলের পাশাপাশি বিপিডিবির কাছে পাওনা আদায়ের অগ্রগতি এবং পরিচালন নগদ প্রবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী হতে পারে। বিপরীতে নগদ অর্থের সংকট বজায় থাকলে লভ্যাংশ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, কেপিসিএলের আয় ও সম্পদমূল্যের উন্নতি ডিভিডেন্ড বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু পরিচালন নগদ প্রবাহের দুর্বলতা সেই সম্ভাবনার পথে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে আগের বছরের ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাওয়া যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ২৮ অক্টোবরের পর্ষদ সভায় পর্যালোচিত নিরীক্ষিত হিসাব এবং কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ডিভিডেন্ড সুপারিশই এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধারণা দেবে।

সর্বশেষ