ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ট্রেন বাতিল ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি বলেছেন, গত ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অশান্তি এড়াতেই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন ঘিরে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ওই দিন ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪০টি দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল এবং বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড স্থাপনের অভিযোগ ওঠে। এতে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জনজীবন ব্যাহত হয়। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার অভিযোগও ওঠে।
এর আগে ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনো আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে জনজীবন অচল করে দেওয়া যাবে না। পরদিন বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার, মেট্রো কর্তৃপক্ষ ও দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেন। সেই নোটিশের জবাবে হলফনামা দিয়ে ক্ষমা চান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব।
হলফনামায় গোবিন্দ মোহন দাবি করেন, ১০ অক্টোবর প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই সিজেপি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ জুলাই সংগঠনটির ডাকা ‘পার্লামেন্ট চলো’ কর্মসূচিতেও সহিংসতা ঘটে এবং অনেকে আহত হন। আগের ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুলিশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়।
স্বরাষ্ট্রসচিব আরও জানান, ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত রাইসিনা হিলসের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় শুধু সেলুলার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তাঁর দাবি, ওয়াই-ফাই ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু ছিল।
পুলিশের বক্তব্য ও বিরোধীদের অভিযোগ
দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারও সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ কমিশনারের দাবি, রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাইয়ের আন্দোলনে সহিংসতা ও সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ ১০ অক্টোবর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।
হলফনামায় আরও দাবি করা হয়, ওই দিন আটক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁদের খাবার ও পানীয় দেওয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক রাজনীতিকদের মর্যাদাহানি হয়, এমন কোনো আচরণ করা হয়নি বলেও দাবি করেছে পুলিশ।
তবে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, ওই দিন পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালায়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা তরুণ-তরুণীদের সামনে আনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুলিশি আচরণের অভিযোগসংবলিত একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষের হলফনামায় বলা হয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং পুলিশের পরামর্শে ১০ অক্টোবর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে তিন শতাধিক স্টেশনের মধ্যে এসব স্টেশন বন্ধ থাকলেও মেট্রোর অন্যান্য অংশে পরিষেবা চালু ছিল বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগ, ভিডিও সংরক্ষণের নির্দেশ
বিক্ষোভ চলাকালে দিল্লি পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিকদের যৌন হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে দায়ের করা মামলার শুনানি বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে হয়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত পুলিশকে ঘটনার সব ভিডিও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেন কোনো দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে নির্দেশ দেন তিনি।
শুনানিতে তুষার মেহতা বলেন, বর্তমানে প্রকৃত সাংবাদিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরিকারীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, অনেকেই ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক পরিচয়ে হাতে মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা নিয়ে ঘটনা ধারণ করেন।
এদিকে, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি নিষিদ্ধ করে দিল্লি পুলিশের জারি করা নির্দেশিকার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশকে নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানতে চেয়েছেন, দিল্লিতে বিক্ষোভের বিকল্প স্থান নির্ধারণ নিয়ে ৯ অক্টোবরের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতেই যন্তর মন্তরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে কি না।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে তুষার মেহতা আদালতকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর আইনজীবী মুক্তা গুপ্তা বলেন, প্রতিবাদের স্থান এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, তা আদালত বিবেচনা করবেন।
রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে নোটিশ
এদিকে, বিরোধী নেতাদের সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিলের ঘটনায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবকে নোটিশ দিয়েছেন আদালত। বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া এ বিষয়ে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে বিচার বিভাগকে লক্ষ্যবস্তু করা দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সমর্থনযোগ্য নয়।
বৃহস্পতিবার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, কেউ বিচার বিভাগকে ভয় দেখাতে বা প্রভাবিত করতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, বিচারকেরা গজদন্তমিনারে বসে নেই; কোথায় কী ঘটছে, তাঁরা তা জানেন। ওই মামলাতেই রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের মামলা
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থে কারচুপি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া। এ দাবিতে জোটের নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
একই বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও তাঁরা সফল হননি। পরে বিরোধী নেতারা মিছিল করে সুপ্রিম কোর্টে যান এবং এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সদস্য জ্ঞানেশ কুমার, সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর কাছে জবাব চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।
























