ডলারের বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে এসব ডলার সরবরাহ করা হয়। বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়তে থাকায় বিনিময় হার ১২৪ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছিল। সেবার প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ডলার বিক্রির দর বেড়েছে ৮৫ পয়সা।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকার বেশি দামে বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছিল। এ দরে ডলার কেনাবেচা শুরু হলে বাজারে বিনিময় হার ওই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন প্রায় ১০ পয়সা করে ডলারের দাম বাড়ছিল।
ছুটির আগে ডলারের চাহিদা বেড়েছে
গত রোববার আমদানি ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা। প্রবাসী আয় কেনার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো প্রায় একই দরে ডলার সংগ্রহ করেছে।
সামনে টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ছুটির সময়ে আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু রাখতে ব্যাংকগুলো নিজেদের নস্ট্রো হিসাবে পর্যাপ্ত ডলার জমা রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি পূজার ছুটি শেষে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বৈদেশিক মুদ্রায় দায় পরিশোধের প্রয়োজনও রয়েছে। এসব কারণে আগাম ডলার সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিনিময় হারে অস্বাভাবিক চাপ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার সরবরাহ করা হবে। আপাতত ডলারের দাম ১২৪ টাকা অতিক্রম করুক, তা চায় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে ডলারের চাহিদা
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। একই পরিমাণ জ্বালানি তেল ও সার কিনতে আগের তুলনায় বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
আমদানির চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এলসি খোলার পরিসংখ্যানেও। সেপ্টেম্বরে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ডলার বা ৩ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।
ডলারের দর বাড়লে পণ্যমূল্যেও চাপের আশঙ্কা
ডলারের বিনিময় হার বাড়লে আমদানি করা পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল কিনতে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। এতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। দেশে মূল্যস্ফীতি উঁচু পর্যায়ে থাকায় ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষ করে জ্বালানি, সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা কমাতে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
রেমিট্যান্সে মিলছে ডলারের জোগান
আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাহিদা বাড়লেও প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ জোগান হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, অক্টোবরের প্রথম ১৭ দিনে দেশে ১৭৪ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং বাজারে ডলারের সরবরাহ—সব মিলিয়ে বিনিময় হার কোন দিকে যায়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডলারের দাম ১২৪ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে আরও বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে কি না, সেদিকে নজর রাখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।























