ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

হেদায়াতের আলোয় খুঁজে নিন সাফল্যের সঠিক পথ

ধর্ম

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২১:৩০, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

হেদায়াতের আলোয় খুঁজে নিন সাফল্যের সঠিক পথ

মানুষের জীবন যেন এক দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় কেউ সম্পদ অর্জনের পেছনে ছুটছে, কেউ জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে ব্যস্ত, আবার কেউ খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার শিখরে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে সাফল্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে এবং তা অর্জনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। কিন্তু জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে এসব অর্জনও একসময় অর্থহীন মনে হতে পারে। কারণ, মানুষ শুধু ভোগ করার জন্য বেঁচে থাকে না; সে জানতে চায়—কেন তার এই জীবন, কোথায় তার গন্তব্য এবং কোন পথে চললে জীবন সার্থক হবে।

মানুষের এই চিরন্তন অনুসন্ধানের উত্তর দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম শুধু জীবনযাপনের উপকরণ সংগ্রহ করতে শেখায় না; বরং জীবনকে একটি মহৎ উদ্দেশ্যের অধীনে পরিচালিত করতে শেখায়। পবিত্র কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল পার্থিব অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর হেদায়াত গ্রহণ করে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার মধ্যেই নিহিত।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহ ছাড়া তাদের এমন কোনো অভিভাবক থাকবে না, যারা তাদের সাহায্য করবে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোনো পথ নেই।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৪৬)

কোনো পথ মানুষকে সাময়িক সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু সব পথ তাকে প্রকৃত মুক্তির দিকে নিয়ে যায় না। বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে কোনো পথকে সাফল্যের পথ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি হতে পারে হতাশা, নৈতিক অবক্ষয় কিংবা আত্মিক শূন্যতা। এ কারণেই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক পথ চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে একটি সরলরেখা আঁকলেন। এরপর রেখাটির ডানে ও বাঁয়ে আরও কয়েকটি রেখা টানলেন। তারপর মাঝের রেখাটির ওপর হাত রেখে বললেন, ‘এটি আল্লাহর পথ।’ এরপর তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ‘আর নিশ্চয়ই এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ পথ অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না; তাহলে সেগুলো তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৩)

এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাফল্যের জন্য শুধু চেষ্টা করাই যথেষ্ট নয়; সেই চেষ্টা সঠিক পথে পরিচালিত হওয়াও জরুরি। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিদিনের কাজকর্মে ন্যায়নীতি ও আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন আত্মিক সমৃদ্ধি

বস্তুগত উন্নতি সব সময় মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে না। মানুষের হাতে অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু মনে শান্তি নাও থাকতে পারে। চারপাশে অসংখ্য মানুষ থাকার পরও সে নিঃসঙ্গতায় ভুগতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিজের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকতে পারে।

এর কারণ, মানুষের প্রয়োজন শুধু শরীরকেন্দ্রিক নয়; তার আত্মিক চাহিদাও রয়েছে। দেহের জন্য খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় প্রয়োজন। অন্যদিকে আত্মার প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন বিশ্বাস, নৈতিকতা, আল্লাহর স্মরণ এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট উপলব্ধি।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, জীবনের ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতার মধ্যেও আল্লাহর স্মরণে মনোনিবেশ করা জরুরি। পার্থিব দায়িত্ব পালন এবং আত্মিক উন্নতি—দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মধ্য দিয়েই মানুষ জীবনে পরিপূর্ণতা খুঁজে পেতে পারে।

হেদায়াতের পথে অবিচল থাকার চেষ্টা

হেদায়াতের পথে চলতে গিয়ে নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। কখনো প্রবৃত্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়, কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, আবার কখনো ভুলও হয়ে যায়। তবে ভুলের কারণে হতাশ হয়ে পড়া কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং আন্তরিকভাবে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহের দিশা দেব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯)

আয়াতটি মানুষকে সৎ প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়। হেদায়াতের পথে চলা মানে শুধু বিশ্বাসের কথা বলা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানো।

সঠিক গন্তব্যেই জীবনের সার্থকতা

জীবনের পথ যত দীর্ঘই হোক, গন্তব্য সঠিক না হলে সেই যাত্রা পূর্ণতা পায় না। আর সঠিক গন্তব্যের সন্ধান পেতে প্রয়োজন আল্লাহর হেদায়াত, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা। নিজের কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখা দরকার—আমাদের জীবন কি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি পার্থিব ব্যস্ততা আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

তাই আসুন, আমরা শুধু সফল হওয়ার চেষ্টা না করে সঠিক পথে সফল হওয়ার চেষ্টা করি। এমন জীবন গড়ে তুলি, যেখানে দুনিয়ার কর্মব্যস্ততা আমাদের আখিরাত থেকে গাফেল করবে না; বরং দুনিয়ার প্রতিটি সৎকর্ম আখিরাতের পাথেয় হয়ে উঠবে। হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের জীবন, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের সাফল্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য।