হার্ট অ্যাটাক, স্টেন্ট বসানো, বাইপাস সার্জারি কিংবা হার্ট ফেইলিউরের পর অনেক রোগীর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়, সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠেন অনেকে। আবার সিওপিডি, অ্যাজমা বা অন্যান্য ফুসফুসের রোগে শ্বাসকষ্টের কারণে রোগী নিজেই হাঁটাচলা ও শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেন।
এতে তৈরি হয় একটি চক্র—শ্বাসকষ্ট ও ভয় থেকে কম হাঁটা, কম হাঁটার কারণে পেশির দুর্বলতা, আর পেশির দুর্বলতায় আরও কমে যায় শারীরিক সক্ষমতা।
চিকিৎসক নিয়মিত হাঁটাচলার পরামর্শ দিলেও অনেক রোগী নতুন করে পরিশ্রম করতে ভয় পান। এই চক্র থেকে বের হয়ে নিরাপদে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ফেরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন।
শুধু ব্যায়াম নয়, এটি চিকিৎসার অংশ
অনেকের ধারণা, রিহ্যাবিলিটেশন মানেই কিছু ব্যায়াম করানো। বাস্তবে কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন একটি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি। এতে রোগীর হার্ট, ফুসফুস, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বিবেচনা করে ব্যক্তিভেদে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
রিহ্যাবিলিটেশন শুরুর আগে রোগী কতটা শারীরিক পরিশ্রম সহ্য করতে পারেন, তা মূল্যায়ন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ছয় মিনিট হাঁটার পরীক্ষা, হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, শ্বাসকষ্টের মাত্রা এবং রেটিং অব পারসিভড এক্সারশন (RPE) পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
এরপর রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে বিভিন্ন অনুশীলন শুরু করা হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে হাঁটা বা ট্রেডমিল, সাইক্লিং, অ্যারোবিক কন্ডিশনিং, স্ট্রেংথ ট্রেনিং এবং ব্রিদিং এক্সারসাইজ।
লক্ষ্য শুধু হাঁটানো নয়
কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের মূল লক্ষ্য হলো রোগীকে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।
যাতে তিনি নিরাপদে হাঁটতে পারেন, সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন, বাজার করতে পারেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজেই করতে পারেন—সেই সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে কতটা এবং কী ধরনের ব্যায়াম করা যাবে, তা রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি ফিরতে হবে আত্মবিশ্বাসও
হার্ট অ্যাটাকের পর অনেক রোগীর মধ্যে নতুন করে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ভয় তৈরি হয়। পরিশ্রম করলে বুকে ব্যথা হবে বা শ্বাসকষ্ট শুরু হবে—এমন আশঙ্কায় তাঁরা স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকেও দূরে থাকতে চান।
তাই রিহ্যাবিলিটেশনে শুধু শারীরিক অনুশীলন নয়, রোগীর স্বাস্থ্যশিক্ষা, কাউন্সেলিং এবং মানসিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করাও এর অংশ।
একই সঙ্গে জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি। ধূমপান বন্ধ করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ—এসবও হৃদ্রোগের পর সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কারা রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য উপযুক্ত?
নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে—
-
হার্ট অ্যাটাকের পর
-
পিসিআই বা স্টেন্টিংয়ের পর
-
বাইপাস সার্জারির পর
-
করোনারি আর্টারি ডিজিজের কিছু ক্ষেত্রে
-
হার্ট ফেইলিউরের নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে
তবে প্রত্যেক রোগীর জন্য একই ধরনের কর্মসূচি উপযোগী নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, মানসিক পরিস্থিতি, ফাংশনাল ক্যাপাসিটি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে রিহ্যাবিলিটেশনের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।
হার্টের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর জীবন থেমে যায় না। সঠিক চিকিৎসা, ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার সমন্বয়ে অনেক রোগী আবার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারেন। তবে রিহ্যাবিলিটেশন শুরু বা ব্যায়ামের মাত্রা নির্ধারণের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
























