আগে নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটলেও কোনো সমস্যা হতো না। এখন ১০–১৫ মিনিট হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠছেন। কয়েক তলা সিঁড়ি অনায়াসে ভাঙার বদলে এক-দুই তলা উঠতেই বুক ভারী হয়ে আসছে বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অনেকেই এসব পরিবর্তনকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব মনে করে এড়িয়ে যান। কিন্তু শরীরের এমন ছোট ছোট পরিবর্তন কখনো কখনো হৃদ্রোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
হার্টের সমস্যায় সব সময় যে তীব্র বুকব্যথা হবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগের শুরুতে উপসর্গ খুবই হালকা থাকে কিংবা একেবারেই বোঝা যায় না। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময় নতুন করে দেখা দেওয়া শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা বুকের অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পরিশ্রমে কেন উপসর্গ দেখা দেয়
হার্টের রক্তনালিতে ধীরে ধীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে রক্তনালি সরু হয়ে যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে শরীর অনেক সময় এই সংকোচন সামলে নেয়। ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় তেমন কোনো সমস্যা নাও দেখা দিতে পারে।
কিন্তু হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা ভারী কাজের সময় হৃদ্যন্ত্রের অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন সরু হয়ে যাওয়া রক্তনালি দিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ সম্ভব না হলে বুকে চাপ বা ভারী ভাব, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
কখনো রক্তনালির ভেতরে জমে থাকা চর্বিযুক্ত আস্তরণে হঠাৎ ফাটল তৈরি হয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এতে রক্তপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই নতুন কোনো উপসর্গকে শুধু বয়সের কারণে হচ্ছে ধরে নিয়ে অবহেলা করা ঠিক নয়।
যেসব পরিবর্তনে সতর্ক হবেন
আগে যে কাজ সহজেই করতে পারতেন, সেটি এখন করতে গিয়ে অস্বাভাবিকভাবে হাঁপিয়ে উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করুন—
- হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুকে চাপ, ভারী ভাব বা অস্বস্তি।
- অল্প পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা হাঁপিয়ে যাওয়া।
- আগের তুলনায় কাজ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া।
- অকারণে অতিরিক্ত ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা।
- বুক ধড়ফড় করা।
- মাথা ঝিমঝিম বা মাথা ঘোরা।
- অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া।
- পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া।
- শুয়ে থাকার সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
তবে এসব উপসর্গের প্রতিটিই যে হৃদ্রোগের কারণে হবে, তা নয়। ফুসফুসের রোগ, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, স্থূলতা, শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা উদ্বেগ থেকেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, ধূমপানের অভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে। পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের উপসর্গ সব সময় স্পষ্ট নাও হতে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
হার্টের সমস্যা কীভাবে শনাক্ত হয়
হৃদ্রোগ নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হলো রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া ও শারীরিক পরীক্ষা। কখন উপসর্গ হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, হাঁটা বা পরিশ্রমের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে কি না এবং বিশ্রাম নিলে কমে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুস পরীক্ষা করার পাশাপাশি ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতে পারে।
তবে স্বাভাবিক ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম থাকলেই যে হৃদ্রক্তনালিতে কোনো সমস্যা নেই, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রোগীর উপসর্গ ও ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক ট্রেডমিল টেস্ট, সিটি করোনারি এনজিওগ্রাম বা প্রয়োজন অনুযায়ী করোনারি এনজিওগ্রামের পরামর্শ দিতে পারেন।
কোনো রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনই যথেষ্ট হতে পারে। আবার রক্তনালির সংকোচন বা ব্লকের ধরন ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। তাই নিজের ইচ্ছায় একগুচ্ছ পরীক্ষা না করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই গুরুত্বপূর্ণ।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন
ভারী কাজ, হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুক ভারী লাগা, চাপ বা চেপে ধরার মতো অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—বিশেষ করে এসব উপসর্গ নতুন হলে বা আগের তুলনায় বেড়ে গেলে।
বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি বা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়লেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
আর যদি বুকে তীব্র বা চাপ ধরনের অস্বস্তি কয়েক মিনিট ধরে থাকে বা বারবার ফিরে আসে এবং এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকে, তাহলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। অস্বস্তি বা ব্যথা বিশ্রামেও না কমলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
উপসর্গের অপেক্ষা না করে সচেতনতা জরুরি
হৃদ্রোগ প্রতিরোধে শুধু উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করলে চলবে না। রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান পরিহার, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুম—সবই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যাঁদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
হার্টের সমস্যা অনেক সময় হঠাৎ করে ধরা পড়ে মনে হলেও শরীর তার আগে ছোট ছোট সংকেত দিতে পারে। তাই আগের তুলনায় হাঁটতে কষ্ট হওয়া, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া, বুক ভারী লাগা কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
























