ঢাকা   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হতে চায় এনসিসি

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হতে চায় এনসিসি

ইসলামি ধারার ব্যাংকিং খাতে আমানত, বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। গত জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে এসব ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের মাসভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে আমানত ও বিনিয়োগে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখা গেলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত কম রয়েছে। ফলে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে নজর রাখতে হবে পরবর্তী সময়ের তথ্যের দিকে।

দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংক রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগস্ট শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মোট কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১২৪ জন। জুলাই শেষে এ সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ১১৫ জন। এসব ব্যাংকের মধ্যে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলক ভালো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমানত ও বিনিয়োগে অগ্রগতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। জুলাই শেষে এ পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক মাসে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা বা ০.৯০ শতাংশ।

তবে ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় আমানত কমেছে ১.৬৯ শতাংশ। ফলে এক মাসের প্রবৃদ্ধি দিয়ে পুরো খাতের সংকট কেটে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অর্থায়নেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে। আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। জুলাই শেষে তা ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের আগস্টে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

সে হিসাবে এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্সে ১৬.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

প্রবাসী আয় সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে। আগস্ট মাসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

অর্থাৎ, এক মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আগের মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.২০ শতাংশ।

তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে চিত্রটি মিশ্র। আগস্টে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। জুলাইয়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক মাসে আমদানি বেড়েছে ৪.৮৯ শতাংশ। আগের বছরের আগস্টের তুলনায় বেড়েছে ৬.৫১ শতাংশ।

অন্যদিকে, আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হতে চায় এনসিসি

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক। ইতিমধ্যে ব্যাংকটি চারটি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করেছে। চলতি বছরে আরও কয়েকটি শাখা রূপান্তর এবং ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তর হতে চায় এনসিসি ব্যাংক। এ জন্য রূপান্তরের রূপরেখা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

এর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক নাম পরিবর্তন করে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক হয়েছে। অন্যদিকে, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাম হয়েছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। একইভাবে এনসিসি ব্যাংকের নামও পরিবর্তন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

আরও শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং সেবা

গত সেপ্টেম্বরে এনসিসি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। এসব শাখাকে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তরের পরিকল্পনাও জানিয়েছে ব্যাংকটি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও ৪০টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনসিসি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া সুকুক বন্ডে ব্যাংকটির বিনিয়োগ রয়েছে ৪৪৮ কোটি টাকা।

ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতেও কাজ করছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের (বিআইআইএফ) মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণ মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহে অগ্রগতি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এনসিসি ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ এ খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক এবং রপ্তানি আয় কমেছে। তাই এই অগ্রগতি কতটা টেকসই হয়, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোর আর্থিক সূচকের ওপর।

সর্বশেষ