শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের মুনাফা বাড়লেও নগদ প্রবাহে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়েছে মাত্র ১ পয়সা। বিপরীতে, শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ইতিবাচক ৯ টাকা ২১ পয়সা থেকে কমে ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সায় নেমেছে।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমেছে। অন্যদিকে, সরবরাহকারীদের পরিশোধ বেড়েছে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব কারণে নগদ প্রবাহে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গত জুলাইয়ে কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও পরে তা আবার চালু হয়েছে। তবে এই ঘটনার আর্থিক প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, সামান্য মুনাফা বৃদ্ধি, নগদ প্রবাহের দুর্বলতা ও ঋণ পুনর্গঠনের মধ্যে কোম্পানিটির ২০২৬ অর্থবছরের ডিভিডেন্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগামী ২৭ অক্টোবর পরিচালনা পর্ষদের সভায় নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। এরপরই ডিভিডেন্ডের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রথম নয় মাসে ইপিএস বেড়েছে মাত্র ১ পয়সা
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৯০ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ, ইপিএস বেড়েছে ২ পয়সা।
এ সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ৩ টাকা ৬৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩ টাকা ৫৭ পয়সা। অর্থাৎ, প্রথম প্রান্তিকে আয় ও নগদ প্রবাহ—দুটিতেই সামান্য উন্নতি হয়েছিল।
দ্বিতীয় প্রান্তিকেও আয় বেড়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৯১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১ টাকা ৯০ পয়সা।
ফলে প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির ইপিএস দাঁড়ায় ২ টাকা ৮১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২ টাকা ৭৮ পয়সা। অর্থাৎ, ছয় মাসে আয় বেড়েছে ৩ পয়সা।
তবে একই সময়ে নগদ প্রবাহে বড় অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৬৮ টাকা ১৯ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ইতিবাচক ৩ টাকা ৯০ পয়সা।
তৃতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ সময়ে ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৫৩ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে পুনর্বিবেচিত হিসাবে তা ছিল ১ টাকা ৫৪ পয়সা। ফলে একক প্রান্তিকে আয় কমেছে ১ পয়সা।
সব মিলিয়ে, জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত নয় মাসে ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ৮ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪ টাকা ৭ পয়সা। অর্থাৎ, নয় মাসে আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।
তবে তৃতীয় প্রান্তিকে আয় কমার নির্দিষ্ট কারণ কোম্পানির দেওয়া তথ্যে উল্লেখ নেই। তাই উৎপাদন ব্যয়, বিক্রি বা অন্য কোনো বিষয়কে এর নিশ্চিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
নগদ প্রবাহে এত বড় পতন কেন?
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পরিচালন নগদ প্রবাহের বড় পরিবর্তন।
নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ইতিবাচক ৯ টাকা ২১ পয়সা।
কোম্পানি জানিয়েছে, এ সময়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমেছে। অন্যদিকে, সরবরাহকারীদের পরিশোধ বেড়েছে। এ ছাড়া ঋণপত্রের (এলসি) দায়ের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তর করা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন নগদ প্রবাহের হিসাবকে প্রভাবিত করেছে। তবে ঋণের মেয়াদ পরিবর্তন হলেই ঋণের মোট পরিমাণ কমে যায় না। একইভাবে, ঋণ পুনর্গঠনকে নগদ প্রবাহের অবনতির একমাত্র কারণ বলারও সুযোগ নেই।
এখানে মূল উদ্বেগ হলো, হিসাব অনুযায়ী মুনাফা হলেও ব্যবসা থেকে নগদ অর্থ আসার প্রবাহ দুর্বল হয়েছে। ক্রেতাদের কাছ থেকে সময়মতো টাকা আদায় না হলে দৈনন্দিন খরচ, সরবরাহকারীদের পাওনা ও অন্যান্য দায় মেটাতে চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে ঋণ পুনর্গঠন এবং নগদ প্রবাহের বিভিন্ন খাতে হিসাব সমন্বয়ের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই পূর্ণ বছরের নগদ প্রবাহ ও আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করা জরুরি।
নিট সম্পদমূল্যেও পরিবর্তন
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ছিল ১০৩ টাকা ৭১ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ টাকা ৭২ পয়সায়।
তবে ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে এনএভি কমে হয়েছে ৯৮ টাকা ৫৭ পয়সা।
তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনে ৩০ জুন ২০২৫ তারিখের তুলনামূলক এনএভি পুনর্বিবেচিত হিসাবে ৯৩ টাকা ৪৪ পয়সা দেখানো হয়েছে। সেই হিসাবে মার্চ শেষে এনএভি আগের অর্থবছরের সমাপ্তির তুলনায় বেশি।
তবে আগের প্রতিবেদনে একই তারিখের এনএভি ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা দেখানো হয়েছিল। দুই প্রতিবেদনে এই পার্থক্য থাকায় তুলনার ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচিত হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ হয়েছিল কারখানা
কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রমেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের অনুসন্ধানের জবাবে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইল জানায়, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১৩ জুলাই থেকে কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুসারে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ১৮ জুলাই থেকে কারখানার কার্যক্রম আবার চালু করা হয়।
তবে সাময়িক বন্ধের কারণে উৎপাদন, বিক্রি ও মুনাফায় কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা তখনো মূল্যায়নাধীন ছিল।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কারখানা বন্ধের ঘটনাটি ঘটেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার পর। তাই এটিকে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ইপিএস কমার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পরবর্তী সময়ে কোম্পানির কার্যক্রম ও আর্থিক ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ক্রেডিট রেটিং ‘এ প্লাস’, তবে তা পুরোনো হিসাবের ভিত্তিতে
তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এ প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ ক্রেডিট রেটিং দেওয়া হয়েছে। রেটিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল।
ওয়াসো ক্রেডিট রেটিং কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে এই রেটিং দিয়েছে।
রেটিংটি ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা মূল্যায়নে ইতিবাচক তথ্য হলেও এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বর্তমান নগদ প্রবাহের পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিফলন নয়। তাই সাম্প্রতিক আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে নতুন আর্থিক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২৬ অর্থবছরে ডিভিডেন্ড বাড়বে, নাকি কমবে?
তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের ডিভিডেন্ড নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণ রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ মোট ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১২ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ছিল। প্রতি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারে নগদ ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ছিল ১ টাকা ২০ পয়সা।
তবে ২০২৬ অর্থবছরে একই হারে ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা নির্ধারণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, মুনাফার প্রবৃদ্ধি খুবই সীমিত। প্রথম নয় মাসে ইপিএস বেড়েছে মাত্র ১ পয়সা। এতে মুনাফা ধরে রাখার ইঙ্গিত থাকলেও ডিভিডেন্ড বাড়ানোর পক্ষে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, নগদ প্রবাহ বড় চ্যালেঞ্জ। নয় মাসে পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সা। নগদ ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ও তারল্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্ণ বছরের নগদ প্রবাহের অবস্থা এখানে বিশেষ বিবেচ্য হবে।
তৃতীয়ত, ঋণ পুনর্গঠন ও কারখানার কার্যক্রমের প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। ঋণের মেয়াদ পরিবর্তন, পাওনা আদায় এবং সরবরাহকারীদের পরিশোধের পরিস্থিতি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, পুরোনো ক্রেডিট রেটিং এবং কারখানা পুনরায় চালু হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব তথ্য ডিভিডেন্ড বাড়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
২৭ অক্টোবরের বোর্ড সভায় নজর বিনিয়োগকারীদের
ডিএসইকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৫টায় তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফলসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে।
এই সভার ফলাফল থেকেই কোম্পানিটির পূর্ণ বছরের আয়, আর্থিক অবস্থান এবং ডিভিডেন্ড সুপারিশ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের মুনাফা সামান্য বাড়লেও নগদ প্রবাহের বড় অবনতি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ডিভিডেন্ড কমবে বা বাড়বে—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকা উচিত পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত ইপিএস, পরিচালন নগদ প্রবাহ, ঋণের অবস্থান এবং পরিচালনা পর্ষদের ডিভিডেন্ড সুপারিশের দিকে। এগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই গত বছরের ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ড ধরে রাখা বা বাড়ানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।
























