ঢাকা   বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে সংকটে উত্তরা ফাইন্যান্স

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৩২, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে সংকটে উত্তরা ফাইন্যান্স

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ও পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ বিতরণ, হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গভীর সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। চার বছর ধরে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি এবং পরিচালনা পর্ষদে বারবার পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা ও সুশাসন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

সংকট মোকাবিলায় গত আগস্টে উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) হস্তক্ষেপে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছিল। তবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও হস্তক্ষেপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ, অতিরিক্ত বেতন-ভাতা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঋণ অনুমোদন নিয়ে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মধ্যে বিরোধের জেরে প্রশাসনিক কার্যক্রমেও অচলাবস্থা তৈরি হয়।

এ ছাড়া শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বের সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে। যোগ্য কর্মীদের বাদ দিয়ে পছন্দের লোক নিয়োগের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উত্তরা ফাইন্যান্সের সংকটের আরেকটি বড় কারণ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ না করায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনেরা স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না।

সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২১ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহ মূলধন ঘাটতির চিত্র উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু উত্তরা ফাইন্যান্সের এই হার নেমে গিয়েছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে।

এর পাশাপাশি রয়েছে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা বহিরাগত নিরীক্ষকের ২০২০ সালের অডিট পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ও নীতিমালা অনুসরণ না করে প্রায় ১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জামানতবিহীন ও অননুমোদিত ঋণ বিতরণের মাধ্যমে প্রায় ৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত সেপ্টেম্বর মাসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১২টি পৃথক মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

বারবার পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্তি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের কারণে উত্তরা ফাইন্যান্সের প্রশাসনিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন নতুন প্রশাসকের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অনাদায়ী ঋণ আদায়, আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করাও বড় পরীক্ষা।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নবনিযুক্ত প্রশাসক মোস্তাকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, বকেয়া হিসাব দ্রুত চূড়ান্ত করা এবং অনিয়ম শনাক্ত করে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়াই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, ২০২১ সালের পর নিরীক্ষিত হিসাব না থাকায় বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত হিসাব চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সর্বশেষ