বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসানের চাপ কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফায় ফিরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। তবে মুনাফায় ফিরলেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার বড় ঝুঁকি রয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে থাকা ছয় ব্যাংকে ডেসকোর ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত আটকে রয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছে পাওনা বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নিরীক্ষকের মতে, ব্যাংকে আটকে থাকা আমানত এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় অনিশ্চিত অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখা হয়নি। ফলে ডেসকোর সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখানো হয়ে থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় লোকসান হিসাবভুক্ত করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত মুনাফার পরিবর্তে লোকসানও হতে পারত।
ডেসকোর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে ডেসকোর লোকসান ছিল ১২৫ কোটি টাকা। তখন শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছিল ৩ টাকা ১৫ পয়সা।
মুনাফায় ফেরার পেছনে সুদ আয় ও বিনিময় হার
ডেসকোর মুনাফায় ফেরার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে স্থায়ী আমানত থেকে সুদ আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারজনিত বড় লোকসান না থাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর থেকে ডেসকোর সুদ আয় আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ১২৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে।
ডেসকোর বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৭৫৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা একটি সুরক্ষিত ওভারড্রাফট সুবিধার বিপরীতে জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা হয়েছে।
তবে এসব আমানতের সব অর্থ সমানভাবে ঝুঁকিমুক্ত নয়। আর্থিক সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংকে জমা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে মুনাফায় ফেরার পরও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ছয় ব্যাংকে আটকে ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা
ডেসকোর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ছয়টি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির মোট ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
ব্যাংকভিত্তিক আমানতের পরিমাণ হলো—
-
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক: ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
-
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: ২০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
-
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ১১ কোটি টাকা।
-
পদ্মা ব্যাংক: ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
-
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক: ৩৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
-
ইউনিয়ন ব্যাংক: ২০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট এবং আমানত ও সংশ্লিষ্ট সুদ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে এসব আমানতের বিপরীতে সুদ আয় হিসাবভুক্ত করা বন্ধ রেখেছে ডেসকো।
তবে সম্ভাব্য লোকসানের বিপরীতে কোনো সঞ্চিতি রাখা হয়নি। নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানের আইএফআরএস ৯ অনুযায়ী সন্দেহজনক আর্থিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় লোকসান স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এর ফলে ডেসকোর সম্পদ ও মুনাফা ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন। প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখা হলে ঘোষিত মুনাফার পরিবর্তে লোকসান হতে পারত। একই সঙ্গে নিট সম্পদমূল্য ও শেয়ারপ্রতি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট ব্যক্তিগত আমানতকারী বা অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আমানত ও বিনিয়োগের অর্থ সুদ ছাড়া ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। এ নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে ডেসকো।
গ্রাহকদের কাছে পাওনা ৫৩৬ কোটি টাকা
ডেসকোর আর্থিক ঝুঁকি শুধু ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহকদের কাছে বিপুল অঙ্কের পাওনা অর্থও প্রতিষ্ঠানটির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডেসকোর গ্রাহকদের কাছে মোট পাওনা ছিল ৫৩৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আদায় অনিশ্চিত বা অনাদায়যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন নিরীক্ষক।
এই অর্থের মধ্যে বিহারি ক্যাম্পের কাছে পাওনা ৩১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অন্যান্য খাতে পাওনা রয়েছে ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এসব পাওনা আদায় না হলেও হিসাবের খাতায় তা বহাল রয়েছে।
অন্যদিকে, অনাদায়যোগ্য পাওনার বিপরীতে ডেসকো সঞ্চিতি রেখেছে মাত্র ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। নিরীক্ষকের হিসাবে, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে ৩১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ঘাটতির কারণে ডেসকোর সম্পদ বেশি এবং লোকসান কম দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় অনিশ্চিত অর্থও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণীকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
টানা তিন বছর লোকসানের পর মুনাফা
বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা তিন বছর লোকসান করেছে ডেসকো।
এই তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান জমেছে ১ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত লোকসান ছিল ৮৪০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) ঋণের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত কোনো লাভ বা লোকসান হয়নি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন এবং ২০২৬ সালের ৩০ জুন—উভয় দিনেই ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা।
অন্যদিকে, জাপানি ইয়েনের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণের বিপরীতে ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রাজনিত মুনাফা হয়েছে।
ফলে আগের বছরগুলোর মতো বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি ডেসকোকে। এর পাশাপাশি এফডিআর থেকে সুদ আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আবার মুনাফায় ফিরেছে।
বিদ্যুৎ বিতরণের পরিমাণ বাড়লেও আয় কমেছে
ডেসকোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রাহকদের কাছে বিতরণ করা বিদ্যুতের মোট মূল্য প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৭৭৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ থেকে আয় প্রায় ১ শতাংশ কমে ৬৪১ কোটি টাকায় নেমেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় এবং হুইলিং চার্জ বেড়ে যাওয়াকে আয়ের এই পতনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, অর্থবছরটিতে ডেসকোর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারও বেড়েছে। মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ৭ হাজার ১১৩ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৪৪৪ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অংশ ৪৭ দশমিক ১১ শতাংশ। বাণিজ্যিক ও অফিস গ্রাহকদের অংশ ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং শিল্প গ্রাহকদের অংশ ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।
অর্থাৎ, বিদ্যুতের ব্যবহার ও বিতরণ করা বিদ্যুতের মোট মূল্য বাড়লেও বিতরণ থেকে ডেসকোর আয় কমেছে। বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় এবং হুইলিং চার্জ বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুনাফায় ফিরলেও কতটা স্বস্তিতে ডেসকো?
সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডেসকোর ৪৪ কোটি টাকা মুনাফায় ফেরা ইতিবাচক হলেও আর্থিক ঝুঁকি কাটেনি। এফডিআর থেকে সুদ আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত বড় লোকসান না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে উন্নতি হয়েছে।
কিন্তু ছয় ব্যাংকে আটকে থাকা ১১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং গ্রাহকদের কাছে আদায় অনিশ্চিত ৩২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি না রাখার বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ। নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অর্থের সম্ভাব্য লোকসান যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত করা হলে ডেসকোর ঘোষিত মুনাফা ও সম্পদমূল্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারত।
তাই শুধু মুনাফায় ফেরার তথ্য দিয়ে ডেসকোর আর্থিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। আটকে থাকা আমানত ও গ্রাহকদের পাওনা আদায়, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন এবং নিরীক্ষকের উত্থাপিত আপত্তিগুলোর সমাধানই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেবে।
























