দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অথচ কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকে এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো যাচ্ছে না। কর ও অন্যান্য চার্জ বাদ দিলে প্রকৃত আয় আরও কমছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন অবসরপ্রাপ্ত ও সুদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা।
সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক দ্বিতীয় দফায় আমানতের সুদের হার কমিয়েছে। গত দুই মাসে এসব ব্যাংকে সুদের হার কমেছে ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতে সুদ পাওয়া যেত ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশে। বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংকে এই হার নেমেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে।
হিসাব অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক ১০ লাখ টাকা এক বছরের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে জমা রাখলে বছরে ৭৫ হাজার টাকা সুদ পাবেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হলে সুদের আয় দিয়ে টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। এর সঙ্গে কর, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হলে প্রকৃত আয় আরও কমে যায়।
ব্যাংকারদের মতে, আমানত বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ব্যাংকে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সুদের হার কমছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে আমানতের সুদ কমে যাওয়ায় বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আর্থিক চাপে পড়বেন। যেসব ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে, তাদের নতুন আমানত সংগ্রহে বেশি সুদ দেওয়ার প্রয়োজনও কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কামাল মুজেরি বলেন, ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়লে আমানতও বাড়ে। এতে সুদের হার কমতে পারে। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর ফলে ঋণের সুদ কমার সম্ভাবনা থাকলেও আমানতকারীদের আয় কমে যায়।
আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা দুর্বল
ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কয়েকটি বড় ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ১৫ থেকে ২২ শতাংশ। অন্যদিকে, আগস্ট পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সংকটে থাকা ব্যাংক থেকে অনেক গ্রাহক তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে টাকা সরিয়ে নেওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত বেড়েছে।
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এক বছর মেয়াদি আমানতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক সুদের হার কমিয়েছে ৫০ বেসিস পয়েন্ট এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কমিয়েছে ১০০ বেসিস পয়েন্ট। প্রাইম ব্যাংকে এই হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, ব্যাংকিং খাতে অগ্রিম আমানত অনুপাত বা এডিআর প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত রয়েছে।
এদিকে, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
সোহেল আর কে হুসেইনের মতে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছেন না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ট্রেজারি কর্মকর্তা জানান, ঋণের সুদ ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকায় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সরকারি সিকিউরিটিজে বাড়ছে ব্যাংকের বিনিয়োগ
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। ব্যাংকারদের মতে, সরকারি সিকিউরিটিজের চাহিদা বাড়ায় গত সপ্তাহে ট্রেজারি বিলের সুদের হার তিন বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল।
তবে গতকাল ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩২ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ায় ট্রেজারি বিলের সুদের হার বেড়েছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের হার নিম্নমুখী রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল চাহিদা এবং অতিরিক্ত তারল্যের কারণে আমানতের সুদ কমানোর প্রবণতা বাড়ছে। এতে ঋণগ্রহীতারা ভবিষ্যতে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। তবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাওয়ায় সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
























