ঢাকা   রোববার ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, আদায় মাত্র ৪ কোটি

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৩২, ১ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, আদায় মাত্র ৪ কোটি

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বড় অংশ আটকে আছে মাত্র ২০টি ঋণ হিসাবে। এসব বড় খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সেখান থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের বিপরীতে ছয় মাসে উদ্ধার হয়েছে এক শতাংশেরও অনেক কম। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে এই স্থবিরতা ব্যাংকটির আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রূপালী ব্যাংকের ঋণ পরিস্থিতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশই এখন খেলাপি। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এই ২০টি হিসাবে কেন্দ্রীভূত।

শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় বেক্সিমকো ও চিনিকল করপোরেশন

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে। গ্রুপটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৯৯৪ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, যার কাছে পাওনা ৯০৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ক্রনি গ্রুপের কাছে ৮৭২ কোটি, জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি, নূরজাহান গ্রুপের কাছে ৬৩০ কোটি এবং এইচএস কম্পোজিটের কাছে ৬২০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। মাদারীপুর স্পিনিংয়ের কাছে ৬১৮ কোটি, বদর স্পিনিংয়ের কাছে ৬০৪ কোটি, ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছে ৫০৬ কোটি এবং সাত্তার গ্রুপের কাছে পাওনা ৪০৩ কোটি টাকা।

তবে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বসুন্ধরা পেপার মিলস, ইউনিভার্সেল মেডিকেল, বেনীটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস সাময়িকভাবে খেলাপি তালিকার বাইরে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কোনো ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে বের হলেও তা আদায় হয়ে গেছে—এমনটি নয়। ফলে এসব ঋণের প্রকৃত আদায় পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে ব্যাংক

বড় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে ব্যর্থতার পাশাপাশি সামগ্রিক ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না রূপালী ব্যাংক। চলতি ২০২৬ সালে ব্যাংকটির মোট ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ৩৬১ কোটি টাকা আদায় করেছিল ব্যাংকটি। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এই আদায়ের পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকায়। ফলে বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অবলোপনেও কমছে না চাপ

ঋণ আদায়ে দুর্বলতার মধ্যেও খেলাপি ঋণ অবলোপন বা রাইট-অফ অব্যাহত রেখেছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আরও ৪৯০ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে।

তবে অবলোপন মানেই ঋণ মওকুফ নয়; ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেওয়া হলেও এসব ঋণ আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অবলোপন করা ঋণ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

এদিকে ঋণ আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। অর্থঋণ আদালতে রূপালী ব্যাংকের ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা পাওনা আদায়ের বিপরীতে ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

মূলধন ঘাটতি ও লোকসানে চাপে ব্যাংক

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।

একই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৩৩ কোটি টাকা এবং নিট লোকসান ৩৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংস্থান এবং অন্যান্য আর্থিক চাপ মিলিয়ে ব্যাংকটির মুনাফায় ফেরার পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।

ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকেই দুর্বল করে না, আমানত ও মূলধন ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি করে। এতে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় রূপালী ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন ও আস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি আদায়

তবে সংকটের মধ্যেও কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার, খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং মূলধন ঘাটতি কমানো। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ (পিসিএ) কাঠামোর আওতায় ব্যাংকটির ওপর তদারকি জোরদার করেছে এবং শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ আদায় বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

তবে নির্দেশনা ও তদারকির পাশাপাশি বাস্তবে কতটা অর্থ আদায় করা যাচ্ছে, সেটিই এখন রূপালী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ