শ্রেণিকৃত ও খেলাপি বিনিয়োগের উচ্চহার, পুরোনো বিনিয়োগের অর্থ আত্মসাৎ এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ২০ টাকা ৪১ পয়সা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৬২ পয়সা। একই সময়ে পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে ৩৬ টাকা ১২ পয়সা। কমেছে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও।
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তবে চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করা, খেলাপি বিনিয়োগের অর্থ আদায়, নতুন আমানত সংগ্রহ এবং সম্পদের গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান ১২ টাকা ২৪ পয়সা
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১২ টাকা ২৪ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২০ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয়ের অবনতি হয়েছে ১২ টাকা ৪৪ পয়সা। আগের বছর মুনাফায় থাকলেও চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বড় লোকসানে পড়েছে ব্যাংকটি।
শুধু তৃতীয় প্রান্তিকেই নয়, বছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলও ব্যাংকটির দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৪১ পয়সা। বিপরীতে ২০২৫ সালের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৬২ পয়সা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয়ের অবনতি হয়েছে ২১ টাকা ৩ পয়সা।
নগদ প্রবাহেও বড় অবনতি
মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহেও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ১২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ সূচক ছিল ইতিবাচক ১২ টাকা ৪৪ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহের অবনতি হয়েছে ৪৮ টাকা ৫৬ পয়সা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে আমানতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পরিচালন নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একক হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত সময়ে ব্যাংকটির একক এনওসিএফপিএস দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সা।
পরিচালন নগদ প্রবাহের এই অবনতি ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে নগদ অর্থের প্রবাহে চাপের বিষয়টি তুলে ধরছে। বিশেষ করে আমানত কমে যাওয়ার বিষয়টি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নয় মাসে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য কমেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ
ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও (এনএভি) উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ২৩ টাকা ৬৪ পয়সা। অথচ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এ মূল্য ছিল ৪৪ টাকা ৫২ পয়সা। অর্থাৎ নয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে ২০ টাকা ৮৮ পয়সা বা প্রায় ৪৬ দশমিক ৯০ শতাংশ।
লোকসানের পেছনে বিনিয়োগ আয় কমার প্রভাব
ব্যাংকটির আর্থিক ফলাফলের অবনতির কারণও ব্যাখ্যা করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের কারণে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ও খেলাপি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এসব বিনিয়োগ থেকে আয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বিধিগত সীমাবদ্ধতা থাকায় প্রত্যাশিত আয় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের সামগ্রিক আয় ও মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমানতের স্থিতি কমে গেলেও আমানতকারীদের বিপরীতে পরিশোধিত মুনাফার পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ একদিকে বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে, অন্যদিকে আমানতের বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে। এ দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ব্যাংকটির আর্থিক ফলাফলে চাপ তৈরি হয়েছে।
ঘুরে দাঁড়াতে মূলধন ও আমানত সংগ্রহে জোর
চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করা, সম্পদের গুণগত মান উন্নত করা, বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার এবং আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো বিনিয়োগের বিপরীতে আটকে থাকা অর্থ আদায় এবং শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের পরিস্থিতি উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া আমানতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পরিচালন নগদ প্রবাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ উন্নত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করা, সম্পদের মান উন্নয়ন, বিনিয়োগের অর্থ আদায় বৃদ্ধি এবং নতুন আমানত সংগ্রহের উদ্যোগ ভবিষ্যতে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আয় বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি মুনাফা ও পরিচালন নগদ প্রবাহেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে ব্যাংকটি।
























