ঢাকা   রোববার ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

বিনিয়োগ ও কমিশন আয় কমায় বিপর্যস্ত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মুনাফা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১২, ১ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বিনিয়োগ ও কমিশন আয় কমায় বিপর্যস্ত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মুনাফা

বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে ২৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ খাতের আয় কমেছে আরও ৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানত ও প্লেসমেন্টের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধ এবং পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। আয় কমা ও ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা থেকে ১২৩ কোটি টাকার বেশি পরিচালন লোকসান হয়েছে। একই সময়ে সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৫২ পয়সা।

ব্যাংকটির তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও অবনতি হয়েছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান ১ টাকা ৪৩ পয়সা

২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১ টাকা ৪৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১৮ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয়ের অবনতি হয়েছে ১ টাকা ৬১ পয়সা।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা। বিপরীতে ২০২৫ সালের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৫২ পয়সা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয়ের অবনতি হয়েছে ১ টাকা ৯২ পয়সা।

পরিচালন মুনাফা থেকে ১২৩ কোটি টাকার লোকসান

ব্যাংকটির পরিচালন ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত প্রথম নয় মাসে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১২৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ১৮৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফা করেছিল।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির পরিচালন ফলাফলে ৩০৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার নেতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আগের বছরের পরিচালন মুনাফার অবস্থান থেকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বড় অঙ্কের পরিচালন লোকসানে চলে গেছে ব্যাংকটি।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া, কমিশন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় খাতের আয় হ্রাস এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধিই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

বিনিয়োগ আয় কমেছে ২৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা

ব্যাংকটির মুনাফায় বড় ধসের পেছনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত প্রথম নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে ২৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

এ আয় কমার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সংকটে থাকা ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা এবং আর্থিক পরিস্থিতি পুনর্বাসনে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা জারি করে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট জারি করা বিআরপিডি-১ সার্কুলার লেটার নম্বর ৩০ বাস্তবায়নের প্রভাব ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

কমেছে কমিশন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় খাতের আয়

বিনিয়োগ আয়ের পাশাপাশি কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ কার্যক্রম থেকেও আয় কমেছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব খাতের আয় কমেছে ৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, আয় কমলেও ব্যাংকটির ব্যয় বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত ও প্লেসমেন্টের বিপরীতে পরিশোধিত মুনাফা বেড়েছে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

ফলে একদিকে বিনিয়োগ, কমিশন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় খাত থেকে আয় কমেছে, অন্যদিকে আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংকটির পরিচালন ও সামগ্রিক মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ

মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহেও (এনওসিএফপিএস) উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সমন্বিত হিসাবে এ সূচক দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৮ টাকা ৮৬ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ কমেছে ৬ টাকা ৮০ পয়সা বা প্রায় ৭৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নগদ অর্থের অন্তঃপ্রবাহ কমে যাওয়াই এ অবনতির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত প্লেসমেন্টের পরিমাণ কমেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্লেসমেন্টের পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ৪৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ৩০ কোটি টাকার মুদারাবা বন্ড পরিশোধ এবং অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিত স্থিতি কমে যাওয়াও নগদ প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিত স্থিতি কমেছে ২৬৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এর পাশাপাশি বিনিয়োগ থেকে আয় ২৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ খাতের আয় ৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা কমে যাওয়াও নগদ অর্থের অন্তঃপ্রবাহ হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্যও কমেছে

ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও (এনএভি) অবনতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমন্বিত হিসাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৫৩ পয়সা। আগের বছরের একই তারিখে এ মূল্য ছিল ১৭ টাকা ১৪ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে ১ টাকা ৬১ পয়সা।

সব মিলিয়ে বিনিয়োগ আয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের আয় কমে যাওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নগদ অর্থের অন্তঃপ্রবাহে চাপের কারণে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে আগের বছরের পরিচালন মুনাফার অবস্থান থেকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে পরিচালন লোকসানে চলে যাওয়ার বিষয়টি ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট করেছে।

সর্বশেষ