শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ২৩টি প্রতিষ্ঠান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি। এসব কোম্পানির মধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে। আবার কিছু কোম্পানি সামান্য মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। ফলে দুর্বল আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড না দেওয়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড ঘোষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৮২টি প্রতিষ্ঠান নগদ অথবা স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। বিপরীতে ২৩টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি।
ডিভিডেন্ড না দেওয়ার পেছনে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও নগদ অর্থের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদনক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধের চাপ কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে তুলতে পারে। তবে প্রতিটি কোম্পানির ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড না দেওয়ার কারণ আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি শেয়ারপ্রতি লোকসান জিল বাংলা সুগার মিলসের
নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেয়ারপ্রতি লোকসানের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে জিল বাংলা সুগার মিলস। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭২ টাকা ৩২ পয়সা। এছাড়া মেঘনা সিমেন্টের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৬৩ টাকা ৬৮ পয়সা, শ্যামপুর সুগার মিলসের ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা এবং বসুন্ধরা পেপার মিলসের ৪২ টাকা ৭৪ পয়সা।
একই সময়ে জুট স্পিনার্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪০ টাকা ২০ পয়সা এবং রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল থেকে লোকসানের চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আইসিবিরও বড় অঙ্কের লোকসান
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি ৭ টাকা ৫২ পয়সা লোকসান করেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ৩৭ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে কমে ৩০ টাকা ২৬ পয়সায় নেমেছে।
অন্যদিকে, ইউসুফ গ্লাস, আজিজ পাইপস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এবং বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের (বিবিএস) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফলও উদ্বেগজনক। এসব কোম্পানির কয়েকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড দেয়নি কিছু কোম্পানি
তবে নো ডিভিডেন্ড তালিকায় থাকা সব প্রতিষ্ঠানই লোকসানে নেই। দেশবন্ধু পলিমার শেয়ারপ্রতি ৩ টাকা ১৫ পয়সা এবং মুন্নু অ্যাগ্রো ৪ পয়সা আয় বা ইপিএস দেখিয়েছে। তারপরও কোম্পানি দুটি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি।
এখানে উল্লেখ্য, কোনো কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ইতিবাচক হলেই ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত হয় না। নগদ অর্থের প্রবাহ, সঞ্চিত লোকসান, ঋণ ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মুনাফা থাকা সত্ত্বেও ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কোম্পানিগুলোর নির্দিষ্ট কারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিষ্কার করা জরুরি।
চার প্রতিষ্ঠান ‘বি’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
এদিকে ডিভিডেন্ড-সংক্রান্ত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ডিএসইর শ্রেণিবিন্যাসে চারটি প্রতিষ্ঠান ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস (বিবিএস), ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), দেশবন্ধু পলিমার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত আইসিবি।
‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়ার ফলে ডিএসইর প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণ সুবিধা পাবেন না। এতে কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড না দেওয়ার ঘটনা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও করপোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের লোকসান করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড না দেওয়া কোম্পানিগুলোর বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ জরুরি। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার নিয়মিত তদারকি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন পরিকল্পনা ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
























