শীতের আগে ইউরোপে গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি। ফলে ইউরোপে গ্যাসের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর এলএনজি সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে।
‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপের অন্যতম প্রধান বিকল্প সরবরাহকারী হয়ে উঠেছিল কাতার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের এলএনজি সরবরাহ বড় ধাক্কা খেয়েছে। এতে এশিয়ার বাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং শীতের আগে ইউরোপের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কাতারের এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে কাতার জানায়, চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর কাতার মাত্র ৯৮টি এলএনজি জাহাজের চালান পাঠাতে পেরেছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে ৬৩৪টি চালান পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরে চালানের সংখ্যা কমেছে ৫৩৬টি।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন এলএনজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির পরিমাণ গত বছর বিশ্বে মোট সরবরাহ হওয়া এলএনজির প্রায় ৯ শতাংশের সমান।
সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে দামের ওপরও পড়েছে। এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। তবে ২০২২ সালের সংকটের তুলনায় পরিস্থিতি এখনো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওই বছর এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ ডলারে উঠেছিল।
ইউরোপের মজুতেও উদ্বেগ
শীতের আগে ইউরোপের গ্যাস মজুত নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুত প্রায় ৭২ শতাংশ পূর্ণ। বছরের এই সময়ে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের মজুত। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ।
জার্মানির পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির গ্যাস মজুত মাত্র ৫৭ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিক্স ওয়ান কমোডিটিজ গত ১০ বছরের শীতকালীন আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে মডেল তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, শীতের আবহাওয়া কঠিন হলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে ইউরোপকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
তবে ইউরোপীয় কমিশন এখনো নভেম্বরের মধ্যে গ্যাসের মজুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল করেনি। যুদ্ধের কারণে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল।
শীত বেশি হলে দাম উঠতে পারে ৪০ ডলারে
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউরোপের সামনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শীত খুব বেশি কঠিন না হওয়া এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চংয়ের মতে, এই দুটি শর্ত পূরণ হলে ইউরোপ গ্যাসের সংকট সামাল দিতে পারবে এবং দামও কমে আসতে পারে।
কিন্তু নভেম্বরে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র শীত পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তখন ইউরোপে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠে যেতে পারে।
শীত দীর্ঘ হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে এলএনজি সংগ্রহের প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে এলএনজি আমদানিনির্ভর এশিয়ার দেশগুলো। কারণ ইউরোপের দেশগুলো সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে সক্ষম। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতিরিক্ত দামে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশে এরই মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শীতকালে ইউরোপের চাহিদা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হলে বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সংগ্রহের চাপও বাড়তে পারে।
চলতি বছর এশিয়ার দেশগুলো এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৭০ লাখ টন কম।
কাতারের বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব
কাতারের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ইউরোপের মজুত পূরণ করতে আগামী শীতের আগে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সালজুড়েও আন্তর্জাতিক গ্যাসের দামে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে সংকটের মধ্যেই বিশ্ব এলএনজি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও বদলাচ্ছে। যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্প চালু হলে ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ববাজারে বড় পরিমাণ অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ আসতে পারে। তখন বর্তমান সংকটের বিপরীতে আবার অতিরিক্ত সরবরাহ ও দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ স্বল্প মেয়াদে এলএনজি বাজারে সরবরাহ সংকট, উচ্চ দাম ও ইউরোপ-এশিয়ার প্রতিযোগিতার ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে নতুন প্রকল্পগুলোর কারণে অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আসন্ন শীতের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী দামে এলএনজি নিশ্চিত করা।
























