হিমালয়ের বিতর্কিত শাকসগাম উপত্যকাকে ঘিরে পাকিস্তান ও চীনের নতুন সীমান্ত উদ্যোগে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। দিল্লির দাবি, যে ভূখণ্ডকে ভারত নিজেদের অংশ বলে মনে করে, সেটিকে পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো আইনি অধিকার পাকিস্তানের নেই। ফলে যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি।
সম্প্রতি পাকিস্তান ও চীন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ সীমান্ত কমিশন সক্রিয় করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে সই করেছে। ইসলামাবাদের ভাষায়, এটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় চলাচল আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু ভারতের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পার্বত্য অঞ্চলটি পাকিস্তান ১৯৬৩ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত সেই চুক্তি কখনো স্বীকার করেনি। দিল্লির অবস্থান হলো, শাকসগাম উপত্যকা তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ এবং বর্তমানে ভারতের লাদাখ অঞ্চলের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ওই ভূখণ্ডে কোনো বৈধ সীমান্ত নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তথাকথিত যৌথ সীমান্ত কমিশনেরও কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
নয়াদিল্লির যুক্তি, পাকিস্তান যে ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে বলে ভারত মনে করে, সেই ভূখণ্ড নিয়ে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আইনি এখতিয়ার ইসলামাবাদের নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ ওই ভূখণ্ডের ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবিকে প্রভাবিত করবে না।
কেন এখন এত গুরুত্ব পাচ্ছে?
পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশনের উদ্যোগটি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ও চীনও হিমালয় সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দুই দেশের বিরোধপূর্ণ সীমান্তের বড় অংশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি দিয়ে পৃথক। কয়েক বছর ধরে সেখানে সামরিক উত্তেজনা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।
এই পরিস্থিতিতে হিমালয়ের অন্য একটি অংশে চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দিল্লি।
দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকবের মতে, যৌথ সীমান্ত কমিশন সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামো নয়। ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিতেই এমন কমিশনের কথা উল্লেখ ছিল। এখন সেটিকে সক্রিয় করার বিষয়টিই নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
জ্যাকবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন তাদের বিভিন্ন সীমান্তকে আরও সুসংগঠিত ও চিহ্নিত করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ও মানুষের চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে তাঁর মতে, ভারতের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি ধারায় বলা হয়েছিল, কাশ্মীর বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি পুনরায় আলোচনার সুযোগ থাকবে।
পাকিস্তান-চীনের বক্তব্য কী?
পাকিস্তানের অবস্থান ভারতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামাবাদ মনে করে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড। তাই ১৯৬৩ সালে চীনের সঙ্গে সম্পাদিত সীমান্ত চুক্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভারতের নেই।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে চীনকে হস্তান্তর করা শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা পুরোনো চুক্তির ধারাবাহিকতা। নতুন কমিশনের মাধ্যমে সেই সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুসেইন হাক্কানির মতে, নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগের পেছনে বাস্তবিক ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের উদ্দেশ্যই থাকতে পারে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
ভারতের জন্য বার্তা কী?
হাক্কানির মতে, পাকিস্তানকে কাশ্মীর ইস্যুতে সমর্থনের পাশাপাশি চীন এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের প্রতিও একটি কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে। তাঁর বিশ্লেষণে, বেইজিং কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের অবস্থানকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে সেই অবস্থানের ভিত্তিতেই পরিচালনা করে।
চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের জন্য ভূ-কৌশলগত একটি বাস্তবতা। কারণ একদিকে ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘদিনের কাশ্মীর বিরোধ রয়েছে। ফলে দুই দেশের সমন্বিত কর্মকাণ্ডকে দিল্লি স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে।
হাক্কানির মতে, চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে আশ্বস্ত করে এবং একই সঙ্গে ভারতকে দুই প্রতিবেশীর সমন্বিত অবস্থানের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়।
সি চিন পিংয়ের ভারত সফরের পরই ঘোষণা
চুক্তির সময়টিও আলোচনায় এসেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লি সফর করেন। এরপরই পাকিস্তান-চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন নিয়ে নতুন ঘোষণা আসে।
হাক্কানির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত সাধারণত দীর্ঘ প্রস্তুতির পর নেওয়া হয়। ফলে সাম্প্রতিক ঘোষণাটিকে শুধু তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে একদিকে পাকিস্তানকে চীনের কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতকেও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তবে অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব মনে করেন, এ উদ্যোগকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কারণ নেই। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসিতে এর তাৎক্ষণিক ও স্পষ্ট কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশন নিয়ে ভারতের আপত্তির মূল কারণ শুধু নতুন কোনো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে শাকসগাম উপত্যকার মালিকানা, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির বৈধতা এবং কাশ্মীর প্রশ্নে তিন দেশের পরস্পরবিরোধী অবস্থান।
নয়াদিল্লি মনে করছে, বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এটি পুরোনো চুক্তি ও বিদ্যমান সীমান্ত সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ। ফলে হিমালয়ের এই দুর্গম অঞ্চলের সীমান্ত ইস্যুটি ভারত-পাকিস্তান বিরোধের পাশাপাশি বৃহত্তর ভারত-চীন ভূ-কৌশলগত সম্পর্কের সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।
























