উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় মানুষের আয় না বাড়ায় প্রয়োজন মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের ব্যয় এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশেও ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশিদের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন কেনাকাটা ও বিল পরিশোধে খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের খরচ বেড়েছে ১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় আয় না বাড়ায় অনেকেই জরুরি খরচ মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। ব্যাংকগুলো সাধারণত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে তুলনামূলক উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে।
ডিপার্টমেন্ট স্টোরেই অর্ধেকের বেশি খরচ
দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মোট ব্যয়ের ৫১ শতাংশই হয়েছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে।
জুনে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৭১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে।
অর্থাৎ জুনে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৬২ শতাংশই গেছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে কেনাকাটায়। মে মাসে এ দুই খাতে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকায়। ফলে এক মাসের ব্যবধানে শুধু কেনাকাটার এ দুই খাতেই ক্রেডিট কার্ডের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
জরুরি খরচেও ভরসা ক্রেডিট কার্ড
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জরুরি প্রয়োজন মেটাতে মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক ঋণের সহজ মাধ্যম হিসেবে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বা পরিচিত কারও কাছ থেকে অর্থ ধার করার পরিবর্তে অনেকেই দ্রুত প্রয়োজন মেটাতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটাতে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিপরীতে মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষকে সংসারের ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে নগদ লেনদেনের পরিবর্তে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ছে। সেবা ও কার্ড ব্যবহারের সুযোগ দেশজুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় মানুষের মধ্যে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডে বিভিন্ন সুবিধা ও অফার দেওয়ায় এসব সুবিধা নিতে অনেকে কার্ড ব্যবহার করছেন। এর বাইরে একটি শ্রেণি জরুরি প্রয়োজনেও ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছে।
বিদেশেও বাড়ছে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডের খরচ
শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশিরা প্রায় ৫৫৩ কোটি টাকা খরচ করেছেন। মে মাসে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশিদের ব্যয় বেড়েছে ১২৮ কোটি টাকা।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। জুনে বিদেশে মোট ৫৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই খরচ হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে থাইল্যান্ডে।
বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যাও
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি দেশে কার্ডের সংখ্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুন শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৫০ হাজার ৫১৩টি। মে মাসে এ সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৪২ হাজার ৪৯টি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতির চাপ, কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন সুবিধা ও অফার এবং জরুরি ব্যয় মেটানোর প্রয়োজন—এসব কারণেই দেশে-বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ও ব্যয় বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ সাধারণত উচ্চ সুদে পরিশোধ করতে হয়। ফলে আয় না বাড়ার পরিস্থিতিতে ক্রেডিট কার্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।























