ঢাকা   বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে বিপিসির ১,৩৫৫ কোটি টাকা আটকে

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে বিপিসির ১,৩৫৫ কোটি টাকা আটকে

জ্বালানি তেলে ভর্তুকির কারণে একদিকে বড় অঙ্কের লোকসান, অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে আটকে আছে বিপুল অর্থ—দুই দিকের চাপেই নগদ অর্থসংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অবরুদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত পাঁচ ব্যাংকেই আটকে আছে প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ৭৫৩ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকে ২২৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২০৯ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংকে ১৫৭ কোটি টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই পাঁচ ব্যাংকে বিপিসির অবরুদ্ধ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা।

পাঁচ ব্যাংকের বাইরে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে প্রায় ২২ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৪৮ কোটি, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে ১৩৩ কোটি এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছে আরও ২২৯ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

বিপিসি মনে করছে, এসব অর্থ দ্রুত ছাড় করা সম্ভব হলে জ্বালানি তেল আমদানির বিল পরিশোধে তৈরি হওয়া চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

ছয় মাসে লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা

বিপিসির তহবিল সংকটের পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলে ভর্তুকি। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।

লোকসানের প্রভাব পড়েছে বিপিসির নগদ অর্থের মজুতেও। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, গত ১ মার্চ হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ২৮৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। ধারাবাহিক লোকসানের পর ১৩ সেপ্টেম্বর তা নেমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৭৯০ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়।

এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না বিপিসি।

দুই মাসের আমদানি ব্যয় মজুত রাখার প্রয়োজন

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্বিঘ্ন রাখতে বিপিসিকে সাধারণত প্রায় দুই মাসের জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ চলতি মূলধন হিসেবে হাতে রাখতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, এ অর্থের প্রয়োজন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা।

বিপিসির একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ৪০টি এলসির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে রাখা হয়েছে। এরপরও এসব এলসির বিপরীতে আরও ১ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অবমুক্ত করে সমন্বয়ের অনুরোধ জানিয়েছে বিপিসি।

ডিজেলে ৭০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি

ভর্তুকির চাপ কমাতে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারত। কিন্তু ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পরও সরকারকে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির সিদ্ধান্ত

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন জানান, জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের জন্য ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বিপিসিকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপিসির ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি আটকে আছে। এসব অর্থ ছাড়ের পাশাপাশি সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকি পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির চলতি মূলধনের চাপ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; সরকারের উচ্চপর্যায়েও এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধ নির্বিঘ্ন রাখা এবং বিপিসির চলতি মূলধনের চাপ সামাল দিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা অর্থ দ্রুত কীভাবে অবমুক্ত করা যায়, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ