ঢাকা   সোমবার ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা, বাড়ছে ব্যাংক খাতের সংকট

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৪৭, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা, বাড়ছে ব্যাংক খাতের সংকট

দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টিই এখন পুঞ্জীভূত লোকসানে, আর এসব ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, মার্চ পর্যন্ত পুরো ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা থাকলেও বিভিন্ন ব্যয়, প্রভিশন ও সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি সমন্বয়ের পর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিবেদনে মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে।

পরিচালন মুনাফা থাকলেও নিট লোকসান ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে আয় ছিল।

কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন, বিভিন্ন ব্যয় এবং সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি সমন্বয়ের পর চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। এসব সমন্বয়ের পর ব্যাংক খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, কাগজে-কলমে পরিচালন মুনাফা থাকলেও ব্যাংকের সম্পদের মান ও ঋণ আদায়ের দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের লোকসান তৈরি হচ্ছে।

২২ ব্যাংক লোকসানে, তালিকায় সরকারি-বেসরকারি উভয়ই

পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে সরকারি, বেসরকারি, বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংক।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক। দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে চারটিই লোকসানের তালিকায় রয়েছে।

এ ছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান লোকসানে রয়েছে।

সবচেয়ে বড় অংশটি অবশ্য বেসরকারি খাতের। লোকসানে থাকা ২২ ব্যাংকের মধ্যে ১৫টিই বেসরকারি ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে—এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

খেলাপি ঋণই বড় চাপ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে ব্যাংকগুলোর লোকসানের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ, প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি, মূলধনের দুর্বলতা এবং সম্পদের মানের অবনতি।

এর সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

অর্থাৎ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ হলেও তার একটি বড় অংশ সময়মতো ফেরত আসছে না। এতে একদিকে ব্যাংকের আয় কমছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। ফলে পরিচালন মুনাফা থাকলেও নিট হিসাবে লোকসান তৈরি হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ

লোকসানে থাকা ১৫টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ১২টির বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক ছাড়া বাকি নয়টি ব্যাংক তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ে এসব ব্যাংকে অনিয়ম এবং ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ারও ব্যাংক খাতে দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সময়ে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো স্বল্প সময়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাংকটি লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

১২ ব্যাংককে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা

ব্যাংক খাতের সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ১৫টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এর পাশাপাশি ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা নিয়েছে।

এর মধ্যে—

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক—১৫,৮১০ কোটি টাকা
  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ—১৭,০০০ কোটি টাকা
  • এক্সিম ব্যাংক—১২,০১০ কোটি টাকা
  • ন্যাশনাল ব্যাংক—১০,৫৬৮ কোটি টাকা
  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—১০,৮৪৩ কোটি টাকা
  • প্রিমিয়ার ব্যাংক—৪,৯০০ কোটি টাকা
  • এবি ব্যাংক—৪,২৭০ কোটি টাকা
  • ইউনিয়ন ব্যাংক—৫,৪২১ কোটি টাকা
  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—৩,০০৪ কোটি টাকা
  • বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক—৬১৫ কোটি টাকা
  • আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক—২৫২ কোটি টাকা
  • পদ্মা ব্যাংক—২৫২ কোটি টাকা

ব্যাংকগুলো যখন আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়া বা দৈনন্দিন লেনদেনের প্রয়োজন মেটাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সংকটে পড়ে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে পারে। তবে এত বড় অঙ্কের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তারল্য ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞের চোখে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, একই সময়ে বিপুল খেলাপি ঋণ এবং এত বেশি সংখ্যক ব্যাংকের লোকসানে থাকা অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নয়।

তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো খেলাপি ঋণের হার। যখন মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যাংক লোকসানে থাকে, তখন পরিস্থিতি উদ্বেগের।

তাঁর মতে, কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বলতা দীর্ঘায়িত হলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকটও তৈরি হতে পারে।

ব্যাংক সংস্কারে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়টিও সংসদীয় কমিটির আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ খেলাপি ঋণ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে সংস্কার প্রস্তাব দেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম তাঁদের দলের পক্ষ থেকেও ব্যাংক খাত সংস্কারের লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় কমিটির কাছে সরকারের জবাবদিহি করার দায়িত্ব রয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিষয় গোপন করা হবে না। ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনীতির রাজনীতিকরণ না করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য সাইফুল আলম দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে বর্তমান সংখ্যক ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ ও সুশাসন

সব মিলিয়ে ২২ ব্যাংকের ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান, ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার নিট লোকসান, প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা—এই চারটি তথ্যই ব্যাংক খাতের গভীর সমস্যার মাত্রা স্পষ্ট করে।

শুধু মূলধন জোগান বা জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে সুশাসন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, সম্পদের মান উন্নয়ন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কার—এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে ব্যাংক খাত কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সর্বশেষ