দেশের ব্যাংক খাতে একদিকে জমছে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য, অন্যদিকে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক এখনো তীব্র তারল্য সংকটে। গত এক বছরে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত তারল্য প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও এর বড় অংশই বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে যাচ্ছে না। বরং বিপুল অর্থ পড়ে রয়েছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট ব্যাংক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
এক ব্যাংকে উদ্বৃত্ত, অন্য ব্যাংকে সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাতের একটি বিপরীতমুখী চিত্র উঠে এসেছে। ভালো অবস্থানে থাকা প্রথাগত বা কনভেনশনাল ব্যাংকগুলোতে যেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য জমছে, সেখানে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক এখনো তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে।
গত বছরের আগস্টে ব্যাংক খাতের মোট তরল সম্পদ—নগদ অর্থ ও সরকারি সিকিউরিটিজ—ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসায় ব্যাংক খাতে তারল্য বেড়েছে।
তবে এই তারল্য পুরো ব্যাংক খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। একদিকে কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত অর্থ পড়ে থাকলেও অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া ও দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ধসের হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংককে দেওয়া বিশেষ ডিমান্ড লোনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পেয়েছে ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংকও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তা পেয়েছে।
অর্থাৎ, ব্যাংক খাতে মোট তারল্য বাড়লেও সব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি সমান নয়। বরং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট এতটাই প্রকট যে তাদের টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিপুল অর্থ সরবরাহ করতে হচ্ছে।
কমেছে নীতিগত সুদ, নিম্নমুখী কলমানি রেট
এদিকে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুদহারও কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদের হার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে।
এর প্রভাবে গত ২৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাংক কলমানি রেট কমে ৮ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই দিনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তারল্য আছে, কিন্তু ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই
ব্যাংক খাতে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার পরও নতুন করে ঋণ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মূলধন ঘাটতি ও বিপুল খেলাপি ঋণ।
চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬৩টি ব্যাংকের মধ্যে ১৫টি ব্যাংক ঋণাত্মক বা নেতিবাচক মূলধন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। ব্যাংক খাতের সার্বিক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআর নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে।
অন্যদিকে জুন শেষে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ আরও বেশি—৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
মুনাফা নয়, বড় লোকসানে ব্যাংক খাত
ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার আরেকটি বড় চিত্র উঠে এসেছে মুনাফার হিসাবে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে ৭৮৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও উচ্চ প্রভিশনিং ও সম্ভাব্য ঋণ লোকসানের সমন্বয়ের পর পুরো ব্যাংক খাত ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা নিট লোকসানে পড়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
ফলে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বাড়লেও সেই অর্থ যে সুস্থ ও উৎপাদনশীল ঋণপ্রবাহে রূপান্তরিত হচ্ছে না, তা স্পষ্ট। একদিকে অতিরিক্ত অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হয়ে পড়ে থাকছে, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ সহায়তা দিতে হচ্ছে।
সংকট কাটাতে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ
ব্যাংক খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট দূর করতে এবং খেলাপি ও দুর্বল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০২৬, অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০২৬ এবং প্রস্তাবিত দেউলিয়া ও পুনর্গঠন আইন ২০২৬ সংশোধনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশের আইনি পথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি এবং কমিটির অন্যান্য সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরবর্তী বৈঠকে আরও বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের বর্তমান চিত্রে বড় ধরনের বৈপরীত্য স্পষ্ট—একদিকে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য, অন্যদিকে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট। ফলে শুধু ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ বাড়লেই সংকট কাটবে না; প্রয়োজন সেই তারল্যকে নিরাপদ ও উৎপাদনশীল ঋণপ্রবাহে ফিরিয়ে আনা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূল সমস্যা সমাধান করা।
























