ঢাকা   সোমবার ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

৩৭ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীর শত শত কোটি টাকা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:০৩, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

৩৭ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীর শত শত কোটি টাকা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে একের পর এক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল। কোম্পানিটির কারখানায় উৎপাদনের কোনো কার্যক্রম না পাওয়ায় দেশে উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭টিতে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা অর্থের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একটি পরিদর্শন দল সম্প্রতি সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের কারখানা পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের সময় সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম চলার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনকি কারখানায় স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমও চলছিল না। পরে সোমবার ডিএসইর ওয়েবসাইটে পরিদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।

তবে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল। শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কোম্পানিটি।

উৎপাদন বন্ধ, আর্থিক অবস্থাও নাজুক

নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কোম্পানিটির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ঋণসুবিধা দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থাও বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি ঋণাত্মক ৩ টাকা ৮১ পয়সা।

এটাই অবশ্য প্রথমবার নয় যে কোম্পানিটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয় বন্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালেও ডিএসইর একটি পরিদর্শন দল কোম্পানিটির কারখানা ও প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে সেগুলো বন্ধ অবস্থায় পেয়েছিল। এমনকি সে সময় পরিদর্শন দল ভেতরেও প্রবেশ করতে পারেনি।

২০১৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল। বর্তমানে কোম্পানিটি ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে। এর পরিশোধিত মূলধন ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার।

শুধু সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল নয়, বন্ধ ৩৭ কোম্পানি

সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলই একমাত্র নয়। গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরও বহু কোম্পানির উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ উৎপাদন বন্ধের কারণ জানিয়েছে, আবার কেউ কোনো ব্যাখ্যাই দেয়নি। কয়েকটি কোম্পানিকে ডিএসইর পরিদর্শন দল সরেজমিনে গিয়ে বন্ধ অবস্থায় পেয়েছে।

সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলকে সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত করলে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭টিতে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে স্টিল, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, প্রকৌশল, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রাসায়নিক খাতের কোম্পানি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কোম্পানির অনেকগুলোতেই দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডিএসইর তথ্য বলছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বন্ধ হয়েছে। তবে কয়েকটি কোম্পানি তারও আগে থেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির উৎপাদন ২০০২ সাল থেকেই বন্ধ। আর বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডসের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ২০১৬ সাল থেকে।

উৎপাদন বন্ধের পেছনে নানা সংকট

এর আগে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। কোম্পানিটি জানিয়েছিল, গত ১ আগস্ট থেকে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ব্যাংক হিসাব স্থগিত হওয়া, ঋণপত্র বা এলসি খোলায় জটিলতা, কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানিতে বাধা, দক্ষ শ্রমিকদের চলে যাওয়া এবং জনবল সংকটের কারণে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার উৎপাদনে ফেরার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিল কোম্পানিটি। তবে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

প্রশ্ন উঠছে নিয়ন্ত্রক নজরদারি নিয়েও

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ রাখলেও কীভাবে সেটি বছরের পর বছর তালিকাভুক্ত অবস্থায় থাকে—এ প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। বিশেষ করে কোনো কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ রাখার পরও যদি নিয়মিত আর্থিক তথ্য প্রকাশ না করে, এজিএম করতে ব্যর্থ হয় এবং আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা কতটা কার্যকর—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকে হাজারো বিনিয়োগকারীর অর্থ। উৎপাদন বন্ধ, নেতিবাচক সম্পদমূল্য, তথ্য প্রকাশে ঘাটতি এবং দুর্বল আর্থিক অবস্থার সমন্বিত প্রভাবে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

এদিকে ডিএসইর তালিকায় বর্তমানে মোট ৩৬০টি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানি ১৬০টি, ‘বি’ শ্রেণির ৭৪টি এবং ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানি রয়েছে ১২৬টি।

ফলে ৩৭টি কোম্পানির উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকার তথ্য শুধু কোম্পানিগুলোর দুর্বলতার চিত্রই তুলে ধরছে না; বরং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মান, করপোরেট সুশাসন, তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

সর্বশেষ