ঢাকা   সোমবার ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, থামছে না শেয়ারবাজারের পতন

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫৯, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, থামছে না শেয়ারবাজারের পতন

শেয়ারবাজার বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলছে, আসছে সংস্কারের নানা পরিকল্পনার কথাও। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—চলমান ধারাবাহিক দরপতন থামবে কবে, আর কীভাবে? বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের অনুষ্ঠানে এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে দেওয়ার আশ্বাস মিললেও বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কোনো স্পষ্ট উদ্যোগের বার্তা না থাকায় হতাশ বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যেই সোমবারও দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।

গতকাল বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাজারের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য দেন।

তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বক্তাদের বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান বাজারের ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে পরদিনও বাজারের পরিস্থিতিতে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং আরও কমেছে সূচক ও লেনদেন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে ভবিষ্যতের সংস্কারের পাশাপাশি বর্তমান সংকট মোকাবিলার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন ছিল।

তাদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বাজার স্থিতিশীল করার কথা বলা হলেও বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর মতো দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাজারের প্রতি আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অথচ তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারকে পুরোপুরি নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়ার নীতি আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের অভিযোগ, বাজারে একটি চক্র বিভিন্ন কৌশল ও ফন্দিফিকিরের মাধ্যমে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতে দিচ্ছে না। ফলে কার্যকর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি থাকলে ওই চক্র আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এতে বাজার পরিস্থিতি আরও তলানিতে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, আগামী দিনের সংস্কার ও পরিবর্তনের কথা বলে বর্তমান দরপতন ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেন নিজেদের দূরে রাখছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে উত্থানের তুলনায় পতনের প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

তাদের মতে, শুধু ভবিষ্যতে বাজারের চেহারা বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; বর্তমান সংকট থেকে বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব। ধারাবাহিক দরপতনে বিনিয়োগকারীদের লোকসান প্রতিদিন বাড়ছে। এ অবস্থায় পতন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের কথা বলা হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হতে পারে।

আবারও বড় পতন

এদিকে আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। কমেছে প্রধান মূল্যসূচক ও টাকার অঙ্কে লেনদেন। একই সঙ্গে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে।

দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৭ দশমিক ০৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৪৫ দশমিক ২৭ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএসইএস ৯ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর নির্বাচিত ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৩ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৮১ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

এদিন ডিএসইতে মোট ৩৮৬টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র ৫৪টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ২৮৪টির এবং ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অপরিবর্তিত রয়েছে।

লেনদেনেও ছিল নিম্নমুখী প্রবণতা। দিনটিতে ডিএসইতে প্রায় ৫৩৭ কোটি ১১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ৫৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

সিএসইতেও সূচকের পতন

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অবশ্য টাকার অঙ্কে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। এদিন সেখানে মোট ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

তবে লেনদেন বাড়লেও সূচকের পতন ঠেকানো যায়নি। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৩টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১২০টির এবং ২২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

দিনশেষে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪০ দশমিক ২১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৬২০ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কার্যদিবসেও সূচকটি ১৭১ দশমিক ২০ পয়েন্ট কমেছিল।

ফলে বাজারের সামগ্রিক চিত্র বলছে, ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান দরপতন এখনো থামেনি। বিনিয়োগকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—শুধু এক বছর পরের পরিবর্তনের ঘোষণা নয়, বরং আজকের বাজারকে স্থিতিশীল করতে কার্যকর পদক্ষেপ।

সর্বশেষ