আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ আবারও খুলছে কোম্পানিগুলোর জন্য। দীর্ঘদিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছে সরকার। ফলে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য এখন আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তিও শেয়ারবাজারে প্রবেশের বিকল্প পথ হিসেবে তৈরি হতে যাচ্ছে। বাজারে নতুন ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি এ সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের শেয়ারবাজার-১ শাখা থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে উপসচিব মো. মামুন রশীদ স্বাক্ষর করেছেন।
২০২০ সালের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর আগে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি স্মারকের মাধ্যমে আরোপ করা বিধিনিষেধ সরিয়ে নেওয়া হলো।
অর্থাৎ, দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর কোম্পানিগুলোর সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের আরোপ করা বড় একটি বাধা উঠে গেল।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিএসইসির গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে।
সরাসরি তালিকাভুক্তি কীভাবে আলাদা?
বর্তমানে কোনো কোম্পানি সাধারণত শেয়ারবাজারে আসতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু করে। সেই শেয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে কোম্পানি বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে।
অন্যদিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন করে আইপিও করে শেয়ার ইস্যু করার পরিবর্তে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারে।
সহজভাবে বললে, আইপিওতে কোম্পানি নতুন শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। আর সরাসরি তালিকাভুক্তিতে বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার বাজারে বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়।
কারা বেশি সুবিধা পেতে পারে?
সরকারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে বিশেষ করে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত, লাভজনক বা শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য শেয়ারবাজারে প্রবেশের একটি বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে।
যেসব কোম্পানির ইতোমধ্যে বড় শেয়ারহোল্ডার রয়েছে এবং বাজারে যাওয়ার মতো পরিপক্ব ব্যবসা রয়েছে, তাদের জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া আইপিওর তুলনায় ভিন্ন একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এর ফলে ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে
সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্যতা, শর্ত ও পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে সোমবারের চিঠিতে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
তাই বাস্তবে কোন কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে, কত শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বা শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোর কী ধরনের শর্ত থাকবে—এসব বিষয় এখন নির্ভর করবে বিএসইসির বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ওপর।
আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বিএসইসির প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালা।
১০ থেকে ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব
সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগেই সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি কমিশন ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সিকিউরিটিজের সরাসরি তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আইপিও ছাড়াই কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ১০ থেকে ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বিএসইসির ওয়েবসাইটেও ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ অন দ্য স্টক এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। এ খসড়ার ওপর সংশ্লিষ্টদের মতামত দেওয়ার জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।
শেয়ারবাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ চালু হলে শেয়ারবাজারে এর কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথমত, আইপিওর বাইরে কোম্পানির তালিকাভুক্তির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি কোনো কারণে প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ায় আসতে আগ্রহী নয়, তারাও বাজারে আসার কথা বিবেচনা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাজারে নতুন ও বৈচিত্র্যময় কোম্পানি যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের বিকল্পও বাড়বে।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ার বাজারে লেনদেনযোগ্য হলে কোম্পানির মালিকানায় স্বচ্ছতা ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে কোম্পানির মান যাচাই, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ যেন দুর্বল বা অতিমূল্যায়িত কোম্পানির বাজারে প্রবেশের পথ না হয়ে ওঠে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইপিওর পাশাপাশি নতুন দরজা
সব মিলিয়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিএসইসির প্রস্তাবিত বিধিমালা—দুই দিক থেকেই সরাসরি তালিকাভুক্তি চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, শেয়ারবাজারে কোম্পানির প্রবেশের দরজা এখন শুধু আইপিওনির্ভর থাকছে না। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তিও একটি বিকল্প পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ শেয়ারবাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কোন কোম্পানিগুলো এই সুযোগ পাবে, কী শর্তে পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো কতটা কঠোর ও স্বচ্ছ থাকে—তার ওপর।
























