ঢাকা   মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

মাথাপিছু জিডিপিতে আবারও ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৩:৩৩, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

মাথাপিছু জিডিপিতে আবারও ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ২০২৬ সালে আবারও ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।

১৩ অক্টোবর প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেও অর্থনীতির মোট আকার ও ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি

এর আগে ২০২০ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে ভারত আবারও এগিয়ে যায়। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস সত্যি হলে চলতি বছর আবারও এই সূচকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।

মাথাপিছু জিডিপি হিসাব করা হয় একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। এটি কোনো ব্যক্তির প্রকৃত আয় নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের গড় হিসাব। ফলে মাথাপিছু জিডিপি বেশি হলেই সাধারণ মানুষের আয় বা জীবনযাত্রার মান তুলনামূলক ভালো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ভারতের অর্থনীতি প্রায় আট গুণ বড়

মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও মোট অর্থনীতির আকারে ভারতের সঙ্গে বড় ব্যবধান রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের মোট জিডিপি ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জিডিপি হতে পারে প্রায় ৫০৬ বিলিয়ন ডলার।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয় এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এই অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় সেই অগ্রগতি ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্রয়ক্ষমতায় এগিয়ে ভারত

মাথাপিছু জিডিপির পাশাপাশি ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাবেও দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। এই পদ্ধতিতে দেশভেদে পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপির ভিত্তিতে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার।

অর্থাৎ, সাধারণ ডলারে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমন্বিত হিসাবে ভারত এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ভারতে তুলনামূলক কম মূল্যস্ফীতি থাকতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাংলাদেশের মানুষের জন্য বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে একটি দেশের মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। আয় ও সম্পদের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের মান এবং মানুষের হাতে থাকা প্রকৃত আয়ের মতো বিষয়ও জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তিত হলেও মাথাপিছু জিডিপির হিসাব বদলে যেতে পারে।

২০২৯ সালে আবারও এগিয়ে যেতে পারে ভারত

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলার এবং ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলার হতে পারে। ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ সামান্য এগিয়ে থাকতে পারে।

তবে ২০২৯ সালে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।

ভারতের অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অবদান বেড়েছে। তাঁর উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদন খাতের অবদান ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, ভারতের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে কমে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধির সুযোগ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পেরেছে।

জ্বালানিসংকটে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় অংশ আমদানি করে। এসব জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। এতে রপ্তানিকারকেরা চাপের মুখে পড়তে পারেন।

অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি কৃষি, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সেবা খাত দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে দুই দেশের অর্থনীতিতেই আয় ও সম্পদের বৈষম্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না; সম্পদ ও আয়ের কেন্দ্রীভবনও উদ্বেগের বিষয়।

সব মিলিয়ে, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এই অবস্থানকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলাই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।