শেয়ারবাজারে পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম কারসাজির মাধ্যমে প্রভাবিত করা এবং অর্থের বিনিময়ে বিনিয়োগ পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ঘটনায় মো. আশরাফুল ইসলামের লেনদেন, বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত কমিটি।
গত ১৩ অক্টোবর জারি করা এক আদেশে এ তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক সুলতানা পারভীন এবং সহকারী পরিচালক লামিয়া আক্তার ও মো. কামাল হোসেন।
তদন্তের আওতায় পাঁচ মিউচুয়াল ফান্ড
বিএসইসির তদন্তের আওতায় থাকা পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ড হলো—এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
কমিটি এসব ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচার সময়, লেনদেনের পরিমাণ, অর্থের উৎস এবং আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী মালিকানা বা বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব পরীক্ষা করবে। এসব হিসাব তিনি নিজে পরিচালনা করতেন, নাকি অন্য কেউ তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করে লেনদেন করতেন, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
পাশাপাশি সমন্বিত, পারস্পরিক, চক্রাকার কিংবা পূর্বপরিকল্পিত লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেনের চিত্র তৈরি করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করবে কমিটি। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগ পরামর্শের অভিযোগ
তদন্তে আশরাফুল ইসলামের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রমও পরীক্ষা করা হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নির্দিষ্ট দামে ইউনিট কেনার পরামর্শ, মূল্যলক্ষ্যমাত্রা কিংবা লেনদেনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে কমিটি।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা অনুমোদন ছাড়াই তিনি বিনিয়োগ গবেষণা, বিশ্লেষণ কিংবা পরামর্শ দিয়েছেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে। তাঁর কাছে অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছিল কি না এবং তিনি বা তাঁর সংশ্লিষ্ট কেউ এ ধরনের তথ্য আদান-প্রদান কিংবা ব্যবহার করেছেন কি না, তাও যাচাই করা হবে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখবে কমিটি
তদন্তে বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরায় অবস্থিত দুটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের শাখায় আশরাফুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল কি না এবং এ ক্ষেত্রে অ্যারেনা সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ভূমিকা কী ছিল, তা পরীক্ষা করা হবে।
এসব প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে অনুমোদনহীন লেনদেন, মার্জিন সুবিধা কিংবা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করেছিলেন কি না, সেটিও অনুসন্ধান করবে কমিটি।
একই সঙ্গে আশরাফুল ইসলাম বা তাঁর সহযোগীরা সংশ্লিষ্ট লেনদেন থেকে কোনো মুনাফা কিংবা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিরূপণ করা হবে। তদন্তে সিকিউরিটিজ আইন, বিধিমালা, প্রবিধান কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, সেটিও নির্ধারণ করবে কমিটি।
যে আইনে তদন্ত
বিএসইসি জানিয়েছে, শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় ১৯৬৯ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশের ২১ ধারা এবং ১৯৯৩ সালের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনের ১৭এ ধারার আওতায় তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্তের আদেশে উল্লিখিত অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত অপরাধ নয়। আশরাফুল ইসলাম কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করেছেন কি না, তা তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের লেনদেন, সম্ভাব্য সমন্বিত কারসাজি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগ পরামর্শ এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা—সব দিক খতিয়ে দেখছে বিএসইসি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হতে পারে।
























