ঢাকা   রোববার ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি না করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২১:৪৩, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি না করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ আপাতত খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখা ও আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল এবং নতুন করে মূলধন জোগানের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন, ঋণদাতা বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে তা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এ পরিস্থিতিতে আপাতত ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ঋণ পুনর্গঠন ও নতুন অর্থায়নের উদ্যোগ

বৈঠকে সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও মতামত উঠে আসে। পাশাপাশি ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করে গ্রুপটির ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন জোগানের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য, এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন নেওয়া না হয়, যার ফলে গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা আরও কমে যায়।

বৈঠকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খানসহ বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা।

‘সব ব্যাংকই গ্রুপটিকে সহায়তা দিতে আগ্রহী’

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপ আগে কখনো খেলাপি হয়নি এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি যাতে বর্তমান সংকট কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলো আগ্রহী।

তিনি বলেন, সব ব্যাংকই গ্রুপটিকে সহায়তা দিতে চায়। বাংলাদেশ ব্যাংকও এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে বলেছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে গ্রুপটি আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে কোনো একটি ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ হলে গ্রুপটির অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, আগের নির্দেশনার মেয়াদ শেষ হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির ঋণ নতুন করে খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। বৈঠকে এ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। গ্রুপটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে ঋণ আদায় আরও কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এককালীন অর্থ জমা দেওয়ার পরিকল্পনা

বৈঠকের বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, সিটি গ্রুপকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পরামর্শ উঠে এসেছে। গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখতে ব্যাংকগুলো কাজ করতে চায়।

অন্যদিকে, সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান জানান, চলতি মাসের মধ্যে সিটি গ্রুপ ঋণ নিয়মিত করার লক্ষ্যে এককালীন কিছু অর্থ জমা দেবে। এরপর ঋণ পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাব পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া গেলে গ্রুপটির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা আরও জানান, ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণসহ ঋণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নেওয়া হয়। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

সিটি গ্রুপের ঋণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পদক্ষেপ, ঋণ পুনর্গঠনের শর্ত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের ওপর।

সর্বশেষ