ঢাকা   সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

বেনামে কোম্পানির মালিকানা গোপন করা যাবে না, সংশোধন হচ্ছে কোম্পানি আইন

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৩:১৯, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বেনামে কোম্পানির মালিকানা গোপন করা যাবে না, সংশোধন হচ্ছে কোম্পানি আইন

কাগজে-কলমে কোম্পানির শেয়ার থাকবে একজনের নামে, অথচ প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে অন্য কারও হাতে—এমন গোপন মালিকানা ঠেকাতে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এ তথ্য গোপন করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোম্পানি নিবন্ধন ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর প্রায় ৪০টি ধারায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনটি প্রণয়নের প্রায় ৩৫ বছর পর বড় ধরনের সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশোধনীর খসড়ায় এক ব্যক্তির কোম্পানি গঠন, শেয়ার হস্তান্তর যাচাই এবং কোম্পানির নথি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পর এটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়া এগোবে।

বেনামি মালিকানা নিয়ে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া থাকার ঘটনা বেনামি মালিকানার বিষয়টি সামনে এনেছিল। কোম্পানিটির মালিকানা তিন ব্যক্তির নামে হস্তান্তর দেখানো হলেও তাঁদের একজন সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।

২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী তদন্তে কোম্পানিটির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শেয়ার ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। এসব ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা শনাক্ত করার আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

নতুন ধারায় প্রকৃত মালিকের পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক

কোম্পানি আইনে নতুন ৩৪(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে শুধু কাগজে-কলমে শেয়ারধারী ব্যক্তিকে নয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে। নির্ধারিত ফরমে এসব তথ্য কোম্পানিকে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কাছে জমা দিতে হবে।

প্রকৃত মালিকানার তথ্য প্রকাশ না করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ছাড়া আইন অমান্যের ঘটনা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এ বিধান কার্যকর হলে অন্যের নামে শেয়ার রেখে প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার, গোপন নিয়ন্ত্রণ এবং কোম্পানির মালিকানা-সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ সহজ হবে।

আদালতের বদলে সিদ্ধান্ত দেবে আরজেএসসি

কোম্পানির সংঘস্মারক সংশোধনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে নিবন্ধকের অনুমোদনের ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্দেশ্য পরিবর্তন, ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা যুক্ত করা কিংবা কোনো উদ্যোগ বিক্রি বা একীভূত করার মতো বিষয়ে আদালতের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন নিবন্ধক।

তবে কোম্পানির সদস্য, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এমন ব্যক্তি এবং পাওনাদারদের স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে পাওনা পরিশোধ বা পাওনাদারকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিধান থাকবে।

নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত মাশুল দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিবর্তন কার্যকর হলে কোম্পানির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় ও ব্যয় কমতে পারে।

কোম্পানি নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা

কোম্পানি নিবন্ধন এবং নথি সংরক্ষণে কাগজের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে সংশোধনীতে। কাগজের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে রেকর্ড, নোটিশ, চুক্তি ও বিভিন্ন ফরম সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে।

শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরকারীর স্বাক্ষর যাচাই করা হয়। নতুন খসড়ায় সশরীর উপস্থিতির পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও সত্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে নথি সত্যায়নের ব্যবস্থাও বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

কোম্পানির নাম নিয়ে বিভ্রান্তি ঠেকাতে বাড়বে জরিমানা

কোম্পানির নাম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে শাস্তির বিধানও কঠোর করার প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান কোনো কোম্পানির নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে মিলে যায়, এমন নামে নতুন কোম্পানির নিবন্ধন দেওয়া হবে না। ভুলক্রমে নিবন্ধন হয়ে গেলে সরকার নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারবে।

বর্তমানে এ নির্দেশ অমান্য করলে কোম্পানির জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য ১০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে কোম্পানির জন্য প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য ৫০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি সচিব পদের সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়াতে ‘সচিব’ শব্দের পরিবর্তে ‘কোম্পানি সচিব’ ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

এক ব্যক্তির কোম্পানি গঠনের সুযোগ

একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক কোম্পানি কাঠামোয় আনার সুযোগ বাড়াতে এক ব্যক্তির কোম্পানি-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এ ধরনের কোম্পানিকে পরবর্তী সময়ে প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নামে ‘পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি’ বা ‘পিএলসি’, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নামে ‘লিমিটেড’ বা ‘লি.’ এবং এক ব্যক্তির কোম্পানির নামে ‘ওয়ান পারসন কোম্পানি’ বা ‘ওপিসি’ ব্যবহারের বিধান থাকবে।

আইন সংশোধনে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক  বলেন, কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করা আরও আগেই প্রয়োজন ছিল। এ নিয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে কাজ চলছে। তবে এবার যে গতিতে উদ্যোগটি এগোচ্ছে, তাতে আইন সংশোধন হওয়ার আশা করছেন তিনি।

ফজলুল হক আরও বলেন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আরজেএসসিকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা জরুরি। শেয়ার হস্তান্তর ছাড়া দপ্তরটির অন্যান্য কার্যক্রমও অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

সব মিলিয়ে, কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোই প্রস্তাবিত সংশোধনীর প্রধান লক্ষ্য। তবে প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হতে হলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

সর্বশেষ