২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তির উদ্ভাবক, মালিক ও রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাম্বাসেডর ফেরদৌস শাহরিয়ার অডিটোরিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘এআই অ্যান্ড ইনোভেশন’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
তাঁর মতে, তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও অল্প কয়েকটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বা অন্য কোনো সংকটের কারণে এসব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এখনই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
এআই হতে পারে বিলিয়ন ডলার আয়ের খাত
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা তুলে ধরে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, এআইকে শুধু সরকারি কাজের গতি বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে হবে না। এআই, সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাংলাদেশের জন্য বিলিয়ন ডলার আয়ের বড় খাত হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ছোট দেশ হয়েও ইসরায়েল হাজার হাজার প্রযুক্তি কোম্পানি ও শক্তিশালী প্রযুক্তি শিল্প গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ ও মেধাবী জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে একইভাবে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সিলিকন ভ্যালি সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, অ্যাপল, মেটা ও এনভিডিয়ার মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। অ্যানথ্রপিকও বাংলাদেশে কাজ করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগে বাণিজ্যিক উইংকে সক্রিয় করার আহ্বান
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উইংকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তিনি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। এসব উইংকে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হওয়া নয়; প্রযুক্তির স্রষ্টা, মালিক ও রপ্তানিকারক হওয়া।”
দেশীয় এআই ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনে জোর
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সেবা, ডিজিটাল পরিচয়, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য কার্যকর এআইভিত্তিক সমাধান তৈরিতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
দেশে তৈরি এসব প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে কাজে লাগিয়ে হার্ডওয়্যার উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন।
কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে প্রযুক্তি শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
দ্রুত জাতীয় কর্মপরিকল্পনার তাগিদ
এআই নিয়ে আলোচনা শুধু সেমিনার বা সংলাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবমুখী ও সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান ইসমাইল জবিউল্লাহ।
এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী সমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
























