বন্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়া ব্যবসা আবার চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে ৩৮টি ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চুক্তিও হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কিংবা আর্থিক সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ কর্মসূচির ঋণ বিতরণ শুরু হতে পারে।
কেন এই অর্থায়ন?
চলতি বছরের মে মাসে অর্থনীতির গতি বাড়াতে সরকার মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর বড় অংশের অর্থাৎ ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে তৈরি পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে।
তবে এই অর্থের সুদের হার কত হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরে সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পর অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
সহজভাবে বললে, কোনো কারখানা অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে কিন্তু সেটি আবার চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক এই কর্মসূচির আওতায় ঋণ দিতে পারবে। যেমন, একটি কারখানা চালু করতে ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলে সেটি একবারে না দিয়ে নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী কয়েক ধাপে অর্থ দেওয়া হবে।
সুদের হিসাব কীভাবে হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক এবার নির্দিষ্ট ৯ শতাংশ সুদে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে তার নীতি সুদহারের সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে তহবিল সরবরাহ করবে।
গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমেছে। ফলে বর্তমানে এই তহবিলের অর্থের কার্যকর হার দাঁড়াচ্ছে ১০ শতাংশ।
এর একটি সুবিধা হলো—ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ালে বা কমালে এই তহবিলের খরচও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে।
তিন বছরে পর্যায়ক্রমে অর্থ ছাড়
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো অর্থ একসঙ্গে ব্যাংকগুলোর হাতে দেওয়া হবে না। প্রায় তিন বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে অর্থ সরবরাহ করা হবে।
ধরা যাক, একটি ব্যাংক তার কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকা অর্থায়ন চাইল। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন এমন কোনো ব্যাংকের সঙ্গে ওই অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে, যার হাতে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। এভাবে অর্থের প্রয়োজন ও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থায়ন করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এতে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘ সময়ের জন্য টাকা আটকে থাকার আশঙ্কা কমবে।
আগেও মতবিরোধ হয়েছিল
সুদের হার নির্ধারণ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহমেদের নেতৃত্বে ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বৈঠক দুটিতেও সব পক্ষের মত এক জায়গায় আসেনি।
বিশেষ করে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডিআর কত রাখা হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। কোনো পক্ষ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ, আবার কেউ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সীমা রাখার পক্ষে মত দেয়।
ঋণের বিপরীতে তারল্য সহায়তা নিয়ে শঙ্কা
ব্যাংকারদের একটি অংশের উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাদের প্রশ্ন, এই কর্মসূচির আওতায় দেওয়া অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জরুরি তারল্য সহায়তা নিতে পারবে কি না।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য জানিয়েছে, এই অর্থ রেপো সুবিধা নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। ফলে কোনো ব্যাংক নগদ সংকটে পড়লে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক তারল্য সংগ্রহের সুযোগ থাকবে না।
হিসাবের খাতায় অর্থটি কীভাবে দেখানো হবে?
এই কর্মসূচিতে ব্যাংকগুলো আরেকটি বিষয় নিয়েও পরিষ্কার ধারণা চাইছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া অর্থ তাদের হিসাবের বইয়ে ঠিক কোন ধরনের সম্পদ হিসেবে দেখানো হবে, সেটি এখনো ব্যাংকারদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সাধারণ নিয়মে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল বা বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ করে এবং প্রয়োজন হলে সেগুলোকে জামানত রেখে রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
কিন্তু এই কর্মসূচির অর্থকে প্রচলিত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকারদের প্রশ্ন—এটি কি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দেওয়া ঋণ হিসেবে দেখানো হবে, নাকি অন্য কোনো হিসাবের আওতায় রাখা হবে?
একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের একজন কর্মকর্তা মনে করছেন, অর্থটি সম্ভবত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ‘প্লেসমেন্ট’ হিসেবে হিসাবভুক্ত হতে পারে।
৬০ হাজার কোটি টাকার পুরো প্যাকেজ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচিতে ৪১ হাজার কোটি টাকা থাকবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে তৈরি পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থায়।
এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে ব্যাংকিং সমস্যা, জ্বালানি সংকট কিংবা মূলধনের ঘাটতির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে আবার সচল করার জন্য।
অন্যদিকে—
- ৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য;
- ১০ হাজার কোটি টাকা যাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে;
- ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে কৃষি-হাব তৈরিতে;
- আরও ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার কাজে।
অবশিষ্ট ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নয়, সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করবে।
এই অংশের অর্থ ব্যবহার করা হবে বিভিন্ন বিশেষ কর্মসূচিতে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফের মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের ঋণ, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বেকারদের ঋণ এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থায়ন।
গ্রাহক সর্বোচ্চ কত সুদ দেবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তহবিল নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের খরচ হবে বর্তমান হিসাবে ১০ শতাংশ। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে ঋণগ্রহীতার ওপর সুদের হার এর চেয়ে কম রাখা হবে।
ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফা নিতে পারবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ হারে অর্থের ব্যবস্থা হলেও গ্রাহকের ওপর পুরো খরচ চাপানো হবে না।
বিশেষ কিছু খাতে আরও কম সুদের সুবিধা থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে স্টার্টআপের ক্ষেত্রে সুদের হার সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ পর্যন্ত নামিয়ে আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। কম সুদের কারণে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা সরকারি বাজেট থেকে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করার কথা রয়েছে।
কর্মসংস্থানই বড় লক্ষ্য
এই বড় অঙ্কের প্রণোদনার পেছনে মূল উদ্দেশ্য শুধু বন্ধ কারখানায় টাকা দেওয়া নয়। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন করে চাহিদা তৈরি, উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থের অভাব, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং সমস্যা কিংবা মূলধনের ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ করেছে, সেগুলোর মধ্যে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার ব্যবসায় ফেরানোই কর্মসূচিটির অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, শিল্প উৎপাদন সচল হলে পুরো কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, ৬০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কত টাকা বিতরণ হলো তার ওপর নয়; বরং সেই অর্থে কতগুলো বন্ধ প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াল, কত নতুন উৎপাদন হলো এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হলো—শেষ পর্যন্ত তার ওপরই এর প্রকৃত ফলাফল নির্ধারিত হবে।
























