বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটকে কেবল খেলাপি ঋণ বা আর্থিক দুর্বলতার ফল হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। প্রতিবেদনের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এই সংকটের মূল কারণ হলো বছরের পর বছর ঋণের নামে সংঘটিত ব্যাপক লুটপাট। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে একটি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর ২০২৫ সালের শেষে নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এটি শুধু একটি আর্থিক সূচকের অবনতি নয়; বরং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা প্রায় ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত বহন করে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতে যে বিপুল খেলাপি ঋণ দেখা যাচ্ছে, সেটি স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ফল নয়; বরং এটি ঋণের নামে ব্যাংক লুটের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর এই মন্তব্য প্রতিবেদনের মূল বার্তাকে সামনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ, বিপুল পরিমাণ ঋণ এমনভাবে বিতরণ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত ব্যবসায় অর্থায়ন নয়, বরং ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করা। ফলে আজ যেগুলো খেলাপি ঋণ হিসেবে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, সেগুলোর বড় অংশই পরিকল্পিত অনিয়ম ও দুর্নীতির ফল।
আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, ২০০৯ সালের পর দেশের কিছু ব্যাংকে যে ঋণ বিতরণ হয়েছে, সেগুলোকে কোনো অর্থেই প্রকৃত ব্যাংকিং বলা যায় না। তাঁর ভাষায়, এসব ঋণগ্রহীতা আসলে ঋণগ্রহীতা নন, বরং লুটেরা। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং অনিয়মের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। ফলে এসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে এবং সেই ক্ষতির ভার এখন পুরো ব্যাংকিং খাতকে বহন করতে হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকটের অন্যতম কারণ হলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি গঠন করতে না পারা। সাধারণভাবে কোনো ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংকের পক্ষে সেই প্রভিশন রাখা সম্ভব হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাতে, যা এখন ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে গেছে। অর্থাৎ, ঋণের নামে যে অর্থ লুট হয়েছে, তার আর্থিক অভিঘাত এখন ব্যাংকগুলোর মূলধনকে পর্যন্ত নিঃশেষ করে ফেলছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থ সহায়তা দিতে হচ্ছে। আরিফ হোসেন খান সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দেশের মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। কারণ ব্যাংক বাঁচাতে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে প্রতিবেদনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেখানে ভারতের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, পাকিস্তানের প্রায় ২১ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ১৯ শতাংশের বেশি, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ঋণাত্মক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কয়েক বছর আগেও পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। কিন্তু তারা তাদের ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঋণের নামে অর্থ লুটের কারণে ব্যাংক খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় দুই ডজন ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবং সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি ছাড় না থাকলে এই ঘাটতি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেত। অর্থাৎ, প্রকৃত আর্থিক চিত্র এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। এটি প্রমাণ করে যে সংকটটি শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর এর গভীর প্রভাব পড়েছে।
খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি খেলাপিতে পরিণত হয়। যদিও পরে কিছু ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে এই সংখ্যা কিছুটা কমানো হয়, তবুও খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি দেখায় যে বহু বছর ধরে গোপন থাকা অনিয়ম ও জালিয়াতি এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রতিবেদনে অবশ্য এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে দেশের সব ব্যাংক একই অবস্থায় নেই। কিছু বেসরকারি ব্যাংক এখনো শক্তিশালী মূলধন কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেছেন, সুশাসন মেনে পরিচালিত কিছু ব্যাংকের সিআরএআর এখনও ১৭ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। তবে অনিয়মে জড়িত ব্যাংকগুলোর বিপুল মূলধন ঘাটতি পুরো ব্যাংক খাতের গড় অবস্থাকে ঋণাত্মক করে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনের তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে যে চিত্রটি উঠে আসে, তা হলো—বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মূলত স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, জালিয়াতি এবং ঋণের নামে সংঘটিত অর্থ লুটের পরিণতি। এই লুটের প্রভাব এখন শুধু ব্যাংকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, আমানতকারীদের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্থিক সুনাম—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
























