বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের চিত্র বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে মে মাসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমেছে। জুলাই-মে সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার কম। অর্থাৎ শেষের দিকে কিছুটা গতি ফিরলেও পুরো বছরের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এটি অনেকটা এমন যে, একজন ব্যবসায়ী বছরের শেষ কয়েক মাসে ভালো বিক্রি করলেও বছরের শুরুতে দীর্ঘ মন্দার কারণে মোট হিসাব শেষে লাভের পরিবর্তে আয় কমে যায়।
মে মাসের উল্লম্ফন কি সত্যিকারের পুনরুদ্ধার?
মে মাসে ইইউতে পোশাক রপ্তানি এপ্রিলের ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এক মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। প্রথম দেখায় এটি খুবই ইতিবাচক খবর। তবে অর্থনীতির ভাষায় এটিকে "বেস ইফেক্ট" বা নিম্ন ভিত্তির ওপর প্রবৃদ্ধি বলেও দেখা যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন দোকানদারের বিক্রি যদি এক মাসে ৫০ হাজার টাকা থেকে পরের মাসে ৬০ হাজার টাকায় ওঠে, তাহলে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ। কিন্তু যদি আগের বছর একই সময়ে বিক্রি ৮০ হাজার টাকা হয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থে সে এখনো আগের অবস্থানে ফিরতে পারেনি। বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
বছরের শুরুতেই ধাক্কা, যার প্রভাব কাটেনি
রপ্তানি কমার মূল কারণ খুঁজতে গেলে অর্থবছরের প্রথম দিকের মাসগুলোর দিকে তাকাতে হবে। জুলাইয়ে যেখানে রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বরে তা নেমে আসে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। আবার ফেব্রুয়ারি ও মার্চেও রপ্তানি ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ও ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল।
এটি অনেকটা ক্রিকেট ম্যাচের মতো। একটি দল যদি প্রথম ১৫ ওভারে খুব কম রান তোলে, তাহলে শেষ পাঁচ ওভারে দ্রুত রান করলেও বড় স্কোর গড়া কঠিন হয়ে যায়। মে মাসের ভালো পারফরম্যান্সও তাই পুরো বছরের দুর্বলতা ঢাকতে পারেনি।
আগের বছরের প্রবৃদ্ধিও ছিল আংশিক বিভ্রম
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৯.১ শতাংশ বেড়ে ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছিল পোশাকের দাম বাড়ার কারণে, অর্ডারের সংখ্যা বাড়ার কারণে নয়।
ধরা যাক, একটি কারখানা আগে ১০ লাখ টি-শার্ট বিক্রি করে ১০ মিলিয়ন ডলার আয় করত। পরে একই ১০ লাখ টি-শার্ট বিক্রি করেও দাম বৃদ্ধির কারণে ১১ মিলিয়ন ডলার আয় করল। তখন আয় বাড়লেও প্রকৃত উৎপাদন বা অর্ডার বাড়েনি। গত বছরের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অনেকটা এমন পরিস্থিতি ছিল।
জার্মানি এখনো সবচেয়ে বড় বাজার, কিন্তু আগের শক্তি নেই
ইইউর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক বাজার জার্মানি। মে মাসে দেশটিতে রপ্তানি বেড়ে ৪০৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এটি এখনো জুলাই মাসের ৪৭২ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের চেয়ে অনেক কম।
এর অর্থ হলো, জার্মান বাজারে কিছুটা উন্নতি হলেও ভোক্তা চাহিদা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি শপিং মলে আগে প্রতিদিন ১,০০০ ক্রেতা আসত, এখন যদি ৮৫০ জন আসে, তাহলে আগের তুলনায় উন্নতি হতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা বলা যাবে না।
ইউরোপের বাজারে কেন কমছে পোশাকের চাহিদা?
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ইউরোপীয় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
একজন ইউরোপীয় ভোক্তা আগে যদি মাসে ২০০ ইউরো পোশাক কেনার জন্য ব্যয় করতেন, এখন হয়তো জ্বালানি, বাসাভাড়া ও খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই বাজেট কমিয়ে ১৫০ ইউরোতে নিয়ে এসেছেন। ফলে পোশাক বিক্রি কমছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশের ওপর।
ইউরোপ এখন প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্র
বাংলাদেশ শুধু ইউরোপে একা প্রতিযোগিতা করছে না। চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোও একই বাজারের জন্য লড়ছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাড়ার পর অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ইউরোপের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে একই ক্রেতার জন্য এখন আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক সরবরাহকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে একটি টেন্ডারে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিত, এখন সেখানে ১৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই মূল্য কমানোর চাপ বাড়বে এবং অর্ডার পাওয়া কঠিন হবে।
দেশের ভেতরের সমস্যাও কম নয়
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যাও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি কাস্টমাইজড পোশাক, নতুন ধরনের কাপড় এবং বিশেষ অ্যাকসেসরিজ চাইছেন। কিন্তু এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও কাস্টমস ব্যবস্থায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
ধরা যাক, একটি ক্রেতা দ্রুত নতুন ডিজাইনের জ্যাকেট চাইল। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানির অনুমোদন পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে গেল। সেই ক্ষেত্রে ক্রেতা অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনে নিতে পারে। ফলে বাংলাদেশ অর্ডার হারায়।
ইইউর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ঝুঁকি
মে মাসে ইইউতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৯২ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক। অর্থাৎ ইউরোপের ভোক্তা চাহিদা কমলেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বড় ধাক্কা খায়।
এটি অনেকটা এমন, যেন একজন ব্যবসায়ীর আয়ের ৯০ শতাংশ আসে মাত্র একজন ক্রেতার কাছ থেকে। সেই ক্রেতা কেনাকাটা কমিয়ে দিলেই পুরো ব্যবসা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
মে মাসের প্রবৃদ্ধি অবশ্যই একটি ইতিবাচক সংকেত। জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড ও নর্ডিক অঞ্চলে কিছুটা চাহিদা বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তবে এটিকে এখনই স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
কারণ পুরো অর্থবছরের হিসাব এখনো নেতিবাচক, বৈশ্বিক অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, ইউরোপে ভোক্তা ব্যয় এখনো চাপে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে।
সারসংক্ষেপ
মে মাসের রপ্তানি বৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য আশার বার্তা হলেও বাস্তব চিত্র এখনো সতর্ক থাকার মতো। ৬৪০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঘাটতি দেখাচ্ছে যে ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, ক্রেতাদের সতর্ক ব্যয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত জটিলতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রেখেছে। আগামী মাসগুলোতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে না পারলে মে মাসের এই পুনরুদ্ধার কেবল সাময়িক স্বস্তি হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
























