ঢাকা   রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ফোন ছিনিয়ে নিতে নিয়ে যাওয়া হয় অপ্রতিমকে, বাধা দেওয়ায় মাথায় লাঠির আঘাত: পুলিশ

গ্রামবাংলা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৬:১৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ফোন ছিনিয়ে নিতে নিয়ে যাওয়া হয় অপ্রতিমকে, বাধা দেওয়ায় মাথায় লাঠির আঘাত: পুলিশ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে (১৩) হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পরিকল্পনা করে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ফোন নিতে বাধা দেওয়ায় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়।

রোববার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, পুলিশের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি করা হচ্ছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর। ১৫ বছর বয়সী কিশোরের বাড়ি সালমানপুর এলাকায় এবং ১৬ বছর বয়সী কিশোর কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনজনের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী আরও এক তরুণকে আটক করে তাঁর সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ অপ্রতিমের সঙ্গে সাইফুলকে দেখতে পায়।

ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে সাইফুল অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছেন। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ওই ফুটেজের সূত্র ধরে সাইফুলকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল অপ্রতিমের ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে আসে। পরে সাইফুলের দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা অনুযায়ী তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।

তবে এর আগে শনিবার রাতে জেলা পুলিশ সালমানপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে ফোনটি উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল।

যেভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি পুলিশের

পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে অপ্রতিমের ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে সাইফুলের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

পুলিশের দাবি, প্রথমে সাইফুল এবং পরে সঙ্গে থাকা দুই কিশোর লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তাঁর আইফোন নিয়ে তিনজন সেখান থেকে চলে যায়।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের এই বিবরণ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলছে।

সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়। বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা, কোটবাড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়।

একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। পরবর্তী একটি ফুটেজে ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছিল। পরে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।

কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ

সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কুমিল্লায় এ পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার তিনজনের সঙ্গে এমন কোনো গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশে মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয়দের আধিপত্যের অভিযোগ নিয়েও সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক অপরাধ এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জানতে চান তাঁরা।

পুলিশ সুপার বলেন, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তাঁর দাবি, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি এবং অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে।

অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কখন বাড়িতে ফিরছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখা প্রয়োজন। অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিল অপ্রতিম

গত শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়িতে ফেরেনি। স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করার পাশাপাশি বিষয়টি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ।

সর্বশেষ