ঢাকা   রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সুদের হার কমছে, তবু বিনিয়োগে গতি নেই কেন?

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৬:৫৮, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

সুদের হার কমছে, তবু বিনিয়োগে গতি নেই কেন?

নীতিগত সুদের হার কমিয়ে ঋণের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য ছিল বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি ফেরানো। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সুদের হার কমলেও বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে তা ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে পৌঁছালেও ডিসেম্বরের জন্য নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা এখনো অনেক কম।

অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মতে, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু ঋণের সুদ কমানো যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করবেন তখনই, যখন ভবিষ্যতে চাহিদা, উৎপাদন এবং মুনাফার বিষয়ে যথেষ্ট নিশ্চয়তা থাকবে।

শিল্প খাতে সেই নিশ্চয়তার ঘাটতিই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাসের স্বল্প চাপ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদনক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ করে উৎপাদন বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা।

অন্যদিকে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগের পথে আরেকটি বাধা তৈরি করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। ফলে একদিকে উদ্যোক্তাদের ঋণের চাহিদা কম, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণেও সতর্কতা—দুই দিক থেকেই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি চাপের মধ্যে পড়ছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। প্রায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে পণ্য ও সেবার বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে চাহিদা কম থাকলে নতুন কারখানা, যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার আগ্রহও কমে যায়।

রপ্তানিমুখী শিল্পও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপ সামলাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে। এতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ফিরিয়ে না এনে শুধু সুদের হার কমালে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ানো কঠিন। তাঁর মতে, ঋণের খরচ কমানো বিনিয়োগের একটি সহায়ক উপাদান; কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বাজারের চাহিদা, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং সম্ভাব্য মুনাফার ওপর।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও মত, বিনিয়োগের গতি ফেরাতে হলে ঋণের সুদ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনের মৌলিক পরিবেশ উন্নত করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ সুদের হার কমে ঋণ সস্তা হলেও, সেই ঋণ নিয়ে উৎপাদন করে লাভ করার নিশ্চয়তা না থাকলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে যাবেন না। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে এখন শুধু সুদের হার নয়—চাহিদা, জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত ও ব্যবসায়িক আস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ