ঢাকা   রোববার ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের নজরদারিতে দুর্বলতা, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:০৬, ১১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের নজরদারিতে দুর্বলতা, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা

শেয়ারবাজারে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর নজরদারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে প্রতারণা ও অনিয়মের ঝুঁকিতে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সমিতিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বনিয়ন্ত্রণ মানে শুধু সদস্যদের ভালো চর্চায় উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং নীতিমালা লঙ্ঘন ও অসদাচরণের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও এর অংশ। প্রয়োজনে সদস্যপদ বাতিলের মতো শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানও এ ক্ষেত্রে সমিতিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সদস্যদের স্বার্থের চেয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলেই স্বনিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে।

বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস নামে একটি সংগঠন থাকলেও সেটি প্রায় নিষ্ক্রিয়। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশও সংগঠনটিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংগঠনটির কাঠামোয় প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য একটি করে ভোটের ব্যবস্থা থাকায় বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব তুলনামূলক বেশি। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পাওয়ার পাশাপাশি তাদের অনিয়ম উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ পরিস্থিতিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সমিতি গঠনের উদ্যোগ নিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য কার্যকর ও প্রাণবন্ত সমিতি গঠনের সুযোগ তৈরি করতে কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবে।

তবে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের অনেকে মনে করেন, প্রতারণার ঘটনা মূলত মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনায় বেশি ঘটেছে। এ ধরনের ফান্ডের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করেছে। বর্তমানে উন্মুক্ত বা ওপেন-এন্ড ফান্ডের আধিক্য বেশি। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে ইউনিট বিক্রি করে অর্থ তুলে নিতে পারেন। ফলে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তুলনামূলক কম বলে দাবি ফান্ড ব্যবস্থাপকদের।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ছিল ওপেন-এন্ড ফান্ডের অধীনে। বিএসইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান বিধিমালায় কাস্টডিয়ান বা সম্পদ সংরক্ষণকারীদের দায়িত্বও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

ব্রোকারদের সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সংগঠনটি থাকা সত্ত্বেও তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিহর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি বা ফিনরার কথা উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারির দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির মূল লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সিকিউরিটিজ খাতে ন্যায়সংগত ও সৎ কার্যক্রম নিশ্চিত করা। প্রতারণা, অনৈতিক আচরণ কিংবা গ্রাহকের সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগে সংস্থাটি বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৩ সালে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা, অতিরিক্ত লেনদেন এবং প্রতিনিধিদের কার্যক্রম তদারকিতে ব্যর্থতার কারণে এসডব্লিউ ফাইন্যান্সিয়ালকে বহিষ্কার করে ফিনরা।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দেশে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি প্রাথমিক পর্যায়ের নজরদারির দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিবিএ মূলত সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি লেনদেনের ক্ষেত্রে উচ্চতর ফি-লিমিটের সুযোগ বাড়ানোর দাবির কথা উল্লেখ করেন।

তবে ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংগঠনটির নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্রোকারের লাইসেন্স স্থগিত হলে তার সদস্যপদও স্থগিত থাকে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় দেশে ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলও রয়েছে। ২০০০ সালের আগস্টে গঠিত এ তহবিল থেকে ব্রোকারের প্রতারণা কিংবা অর্থ ও সিকিউরিটিজ আত্মসাতের শিকার বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। তবে তহবিলের আকার ছোট হওয়ায় ক্ষতির পুরোটা ফেরত পাওয়ার সুযোগ সীমিত।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারদের প্রতি প্রান্তিকে পাঁচ হাজার টাকা করে তহবিলে জমা দিতে হয়। এ ছাড়া কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) রাখা আমানতের সুদ থেকে অর্জিত অর্থের ২৫ শতাংশও তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা এ তহবিল থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতিকে কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতারণার শিকার বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ