ঢাকা   রোববার ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি ঋণ, আইএফআইসির পাওনা ৬০৪ কোটি টাকা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৪৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি ঋণ, আইএফআইসির পাওনা ৬০৪ কোটি টাকা

কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন, অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ অনুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংক থেকে স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে তিন দফায় ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

দুদকের অভিযোগ, ঋণের অর্থ স্কাইমার্কের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বেক্সিমকো গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদন, অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং আইন এবং বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয়েছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামলাটি করেন। এতে সালমান এফ রহমান ও তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ছাড়াও স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল-মনজুর, পরিচালক ইশরাত জাহান লাইজু এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।

তিন দফায় ঋণ অনুমোদন, উত্তোলন ৫৩৮ কোটি টাকা

দুদকের নথি অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে প্রথম দফায় ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট ৯০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ঋণসীমা বাড়িয়ে ১৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

দুদকের অভিযোগ, আগের ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতা কতটুকু এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য রয়েছে কি না, তা পর্যাপ্তভাবে যাচাই না করেই ঋণসীমা বাড়ানো হয়।

ঋণসীমা বাড়ানোর পর ২০২৩ সালের ১২, ১৫ ও ১৭ জানুয়ারি তিন দিনে নগদে ৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। দুদকের দাবি, এ অর্থ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। পরে অর্থের একটি বড় অংশ সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৫ জুন আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৯তম সভায় স্কাইমার্কের ঋণসীমা ১৪৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪৫ কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।

দুদকের অভিযোগ, বর্ধিত ঋণসীমার বিপরীতে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রায় পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৭ ও ৩০ জুন এবং ৩ ও ৭ জুলাই নগদে ৩৯৪ কোটি টাকা তোলা হয়। পাশাপাশি ট্রান্সফার চেকের বিপরীতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয় আরও ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা।

এই চার কার্যদিবসে মোট ৩৯৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয় বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, স্কাইমার্কের নামে উত্তোলিত ঋণের অর্থ বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সটেক্স লিমিটেড, বেক্সিমকো ফ্যাশন লিমিটেডসহ সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

নথিতে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাপট্রিন ট্রেডিং লিমিটেড, টিখ বিল্ড কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, ব্রাইটস্টার লিমিটেড, এক্সিস বিজনেস লিমিটেড, সানস্টার বিজনেস লিমিটেড, ফারইস্ট বিজনেস লিমিটেড, আলফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, নর্থস্টোন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, আর অ্যান্ড আর হোল্ডিংস লিমিটেড, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন ও সেন্ট্রাল ল্যান্ড।

দুদকের দাবি, এসব হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করা হয়েছে। এ কারণে মামলায় অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে।

জামানত নিয়ে প্রশ্ন, ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা

দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, ৫৪৫ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণের বিপরীতে ৬৫০ শতাংশ জমি জামানত হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ওই জমির মালিকানা ও তফসিলসংক্রান্ত তথ্য স্পষ্ট ছিল না।

নথি অনুযায়ী, ডেফারেল মর্টগেজ রেখে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট জমির বন্ধক গ্রহণ করা হয়নি। দুদকের অভিযোগ, জামানতসংক্রান্ত এসব অনিয়মের কারণে ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ঋণের বিপরীতে তৃতীয় পক্ষের মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেডের ১ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার লিয়েন রাখার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ আগস্টের বাজারমূল্য অনুযায়ী, এসব শেয়ারের মূল্য ছিল ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সুদ-চার্জসহ ব্যাংকের পাওনা ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা

দুদকের নথি অনুযায়ী, স্কাইমার্কের নামে অনুমোদিত ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে নগদে ৫৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে ২ কোটি ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিতরণ বা উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা।

সুদ ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা। অর্থাৎ, অনুমোদিত ঋণের তুলনায় ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৬০ কোটি টাকা বেশি।

দুদকের অনুসন্ধানে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সঙ্গে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা, প্রধান কার্যালয়ের ঋণসংক্রান্ত কমিটি, ব্যবস্থাপনা, নির্বাহী কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন ব্যক্তির যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগও রয়েছে।

যা বলছে দুদক

দুদকের কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান খানের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে তিন দফায় ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল। এর বিপরীতে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ করা হয়। সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ আইএফআইসি ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা।

তিনি বলেন, ঋণের অর্থ উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুদকের দাবি, ঋণ অনুমোদন, বিতরণ ও অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগগুলো এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার বিষয়।

 

সর্বশেষ