শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি নাভানা ফার্মা লিমিটেডের আয় ও পরিচালন নগদ প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। আর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থিক সূচকগুলোর এই অগ্রগতিতে আসন্ন বার্ষিক ঘোষণায় ক্যাশ ডিভিডেন্ড বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তবে চূড়ান্ত লভ্যাংশ নির্ভর করবে পুরো বছরের আর্থিক ফলাফল ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর।
কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে নাভানা ফার্মার শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৪ টাকা ৫৯ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩ টাকা ৪৯ পয়সা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১ টাকা ১০ পয়সা বা ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ১০ টাকা ২২ পয়সা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা ৪৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে নগদ প্রবাহ বেড়েছে ৫ টাকা ২২ পয়সা বা ৫১ দশমিক ০৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৪৯ টাকা ৫৩ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষে এ মূল্য ছিল ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা। অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ৪ টাকা ২৪ পয়সা।
কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিক্রয় আয় ও মোট মুনাফা বৃদ্ধি, অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় উন্নতির কারণে আর্থিক সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এদিকে, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে ১২ বছর মেয়াদি ২ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ইউরোর বিদেশি ঋণসুবিধা নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছে কোম্পানিটি।
তিন প্রান্তিকেই আয় বৃদ্ধির ধারা
নাভানা ফার্মার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির সাধারণ শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৭১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ টাকা ২৫ পয়সা। ফলে প্রথম প্রান্তিকে সাধারণ ইপিএস বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।
একই প্রান্তিকে পাতলীকৃত শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১ টাকা ৬৯ পয়সা। এ ছাড়া প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ২ টাকা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এ সূচকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫৪ শতাংশ।
২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির পাতলীকৃত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৬৫ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১ টাকা। ফলে প্রান্তিকভিত্তিক পাতলীকৃত ইপিএস বেড়েছে ৬৫ শতাংশ।
প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির পাতলীকৃত শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩৫ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২ টাকা ২৫ পয়সা। প্রকাশিত অঙ্ক অনুযায়ী, এ সময়ে আয় বেড়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অর্ধবার্ষিক সময়ে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৮ টাকা ১১ পয়সা হয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৪৮ টাকা ৩২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির সাধারণ শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ২২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ টাকা ১ পয়সা। ফলে তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
সব মিলিয়ে প্রথম তিন প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে চতুর্থ প্রান্তিকের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত পুরো অর্থবছরের চূড়ান্ত আয় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২ কোটি ৬৬ লাখ ইউরোর ঋণ
ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নাভানা ফার্মা জার্মানির একেএ আউসফুরক্রেডিট-গেজেলশাফট এমবিএইচের কাছ থেকে ১২ বছর মেয়াদি ২ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ইউরোর বিদেশি ঋণসুবিধা নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত ঋণের অর্থ উৎপাদনসুবিধা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে। ঋণটির ব্যবস্থাপক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশের কেজিএমসি ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস। তবে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অন্যান্য শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিদেশি ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের দায়ও থাকবে। ফলে সম্প্রসারণ প্রকল্পের ব্যয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ’ ঋণমান
ন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিংস লিমিটেড নাভানা ফার্মাকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ ঋণমান দিয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং ঋণমান ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত পাওয়া অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তবে ঋণমান কোম্পানির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিলেও এটি শেয়ারের বাজারদর বৃদ্ধি কিংবা নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ ঘোষণার নিশ্চয়তা দেয় না।
১৫ অক্টোবর বোর্ড সভা, নজর ডিভিডেন্ডে
নাভানা ফার্মার ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য আগামী ১৫ অক্টোবর পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় বার্ষিক আর্থিক ফলাফল এবং লভ্যাংশসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ১৪ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ, ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা ৪০ পয়সা লভ্যাংশের সুপারিশ করা হয়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ইপিএস ও পরিচালন নগদ প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে এবারও লভ্যাংশের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে আগের বছরের তুলনায় লভ্যাংশ বাড়বে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কোম্পানির পুরো বছরের আয়, কর-পরবর্তী মুনাফা, ঋণের দায়, সম্প্রসারণ প্রকল্পে বিনিয়োগ, সঞ্চিত মুনাফা ও নগদ অর্থের অবস্থার ওপর লভ্যাংশের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
কত শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে পারে?
প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় নাভানা ফার্মার ক্যাশ ডিভিডেন্ড নিয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এগুলো বিশ্লেষণভিত্তিক হিসাব, কোম্পানির আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাস নয়।
- ১৪ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড: আগের বছরের মতো একই হারে লভ্যাংশ দিলে প্রতি শেয়ারে ১ টাকা ৪০ পয়সা পাওয়া যাবে।
- ১৫–১৬ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড: লভ্যাংশ বাড়িয়ে এ পর্যায়ে নেওয়া হলে প্রতি শেয়ারে ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৬০ পয়সা পাওয়া যাবে।
- ১৭–১৮ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড: এ হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলে প্রতি শেয়ারে ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পাওয়া যাবে। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এমন উচ্চ হারের লভ্যাংশের সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সার্বিকভাবে, নাভানা ফার্মার প্রথম নয় মাসের আয়, পরিচালন নগদ প্রবাহ ও নিট সম্পদমূল্যের উন্নতি কোম্পানিটির আর্থিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগের বছরের লভ্যাংশ বজায় রাখা বা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের শুধু ইপিএস বৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত ফলাফল, ঋণের দায়, বর্তমান শেয়ারদর ও মূল্য-আয় অনুপাত বিবেচনা করা উচিত। আগামী ১৫ অক্টোবরের বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের পর কোম্পানিটির সম্ভাব্য লভ্যাংশ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।
























