শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ডোরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমসের চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মুনাফা ও নিট সম্পদমূল্যে উন্নতি হয়েছে। তবে একই সময়ে পরিচালন নগদ প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এর পাশাপাশি নরসিংদীর ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্পদ বিক্রি এবং তিন সহযোগী কোম্পানিকে একীভূত করার প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ৮ অক্টোবরের বোর্ড সভায় আসন্ন আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
ডোরিন পাওয়ারের প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে ৪ টাকা ১৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩ টাকা ৫ পয়সা। অর্থাৎ নয় মাসে ইপিএস বেড়েছে ১ টাকা ১১ পয়সা।
তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস বেড়েছে ৭ পয়সা
জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়ে ডোরিন পাওয়ারের সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ১১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই ইপিএস ছিল ১ টাকা ৪ পয়সা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস বেড়েছে ৭ পয়সা।
এদিকে ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি দাঁড়িয়েছে ৫৬ টাকা ২৬ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৫ শেষে যা ছিল ৫২ টাকা ৪৩ পয়সা। অর্থাৎ নয় মাসে শেয়ারপ্রতি এনএভি বেড়েছে ৩ টাকা ৮৩ পয়সা।
তবে মুনাফা ও এনএভি বাড়লেও পরিচালন নগদ প্রবাহে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ বা এনওসিএফপিএস হয়েছে ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১১ টাকা ২৮ পয়সা।
কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কাছ থেকে রাজস্ব বিল বাবদ অর্থপ্রাপ্তি কমে যাওয়ায় এনওসিএফপিএস কমেছে।
ছয় মাসেও মুনাফায় শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে ডোরিন পাওয়ারের সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ২৪ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ৫৩ পয়সা।
ফলে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত ইপিএস দাঁড়ায় ৩ টাকা ৫ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ টাকা ১ পয়সা।
একই সময়ে এনওসিএফপিএস হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা, যেখানে আগের বছরের ছয় মাসে ছিল মাত্র ৪২ পয়সা। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি টাকা ডলার ও ইউরোর বিপরীতে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় মুদ্রা বিনিময়জনিত লোকসান কমেছে। এতে অর্থায়ন ব্যয় কমে ইপিএস বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
নরসিংদীর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্পদ বিক্রি
ব্যবসায়িক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে নরসিংদীর ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থায়ী সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোরিন পাওয়ার।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সঙ্গে কেন্দ্রটির ১৫ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কোম্পানি ওই চুক্তি নবায়ন করতে আগ্রহী নয়। এ কারণে কেন্দ্রটির স্থায়ী সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় কেপিআই ট্রেডিংয়ের সঙ্গে বিক্রেতা চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়। চুক্তির আওতায় জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, রেডিয়েটর, ইঞ্জিন হল, ভবন, বৈদ্যুতিক তার, সুইচগিয়ার, প্যানেল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম বিক্রি করা হবে।
এসব সম্পদের মোট বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা।
তিন সহযোগী কোম্পানিকে একীভূত করার প্রস্তাব
ব্যবসার কাঠামো পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ডোরিন পাওয়ারের সঙ্গে তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—চাঁদপুর পাওয়ার জেনারেশনস, ঢাকা নর্দার্ন পাওয়ার জেনারেশনস এবং ঢাকা সাদার্ন পাওয়ার জেনারেশনস।
তবে এই একীভূতকরণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শেয়ারহোল্ডার ও ঋণদাতাদের অনুমোদনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সহযোগী কোম্পানিগুলোর সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের নগদ অর্থ দেওয়া হবে; তাদের সঙ্গে কোনো শেয়ার বিনিময় করা হবে না। ফলে ডোরিন পাওয়ারের বর্তমান শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে।
কোম্পানির মতে, সব পরিচালন সম্পদ ও কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিয়ে আসার মাধ্যমে পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো, ব্যবস্থাপনা তদারকি শক্তিশালী করা এবং প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক ব্যয় কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
ক্রেডিট রেটিং ‘এ’, দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল
ডোরিন পাওয়ারকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-৩’ ক্রেডিট রেটিং দিয়েছে ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস পিএলসি বা ক্রিসল। কোম্পানিটির রেটিং আউটলুক রাখা হয়েছে স্থিতিশীল।
৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত অনিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য এবং রেটিং ঘোষণার সময় পর্যন্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনায় নিয়ে এই রেটিং দেওয়া হয়েছে।
৮ অক্টোবর বোর্ড সভা, আসছে ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্ত
আগামী ৮ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল সাড়ে ৩টায় ডোরিন পাওয়ারের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হবে।
এর আগে ৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য স্পনসর ও পরিচালক বাদে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছিল কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। অর্থাৎ ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারে ডিভিডেন্ড ছিল ১ টাকা।
এবার ডিভিডেন্ড কত হবে?
চলতি অর্থবছরের ডিভিডেন্ডের পরিমাণ এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ পুরো বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং পরিচালনা পর্ষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তবে নয় মাসের হিসাবে ইপিএস ৩ টাকা ৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৪ টাকা ১৬ পয়সা এবং এনএভি ৫২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৫৬ টাকা ২৬ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে এনওসিএফপিএস ১১ টাকা ২৮ পয়সা থেকে কমে ৪ টাকা ৮৪ পয়সায় নেমেছে।
তাই ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্তে মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি নগদ প্রবাহ, পূর্ণ বছরের আর্থিক ফলাফল, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও কোম্পানির ডিভিডেন্ড নীতিও বিবেচনায় আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডোরিন পাওয়ারের নয় মাসের আর্থিক হিসাবে মুনাফা ও নিট সম্পদমূল্যে উন্নতি দেখা গেলেও পরিচালন নগদ প্রবাহে চাপ রয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্পদ বিক্রি ও সহযোগী কোম্পানি একীভূত করার উদ্যোগ কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এখন ৮ অক্টোবরের বোর্ড সভায় পূর্ণ বছরের আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্তই হবে বিনিয়োগকারীদের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
























