ঢাকা   বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নে গতি নেই, চার মাসে ছাড় মাত্র ১১০ কোটি

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৫৯, ১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নে গতি নেই, চার মাসে ছাড় মাত্র ১১০ কোটি

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না। চালুর প্রায় চার মাস পরও এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১০ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কিমটির আওতায় আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র আটটির অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। ফলে বড় অঙ্কের তহবিল ঘোষণা হলেও বাস্তবে এর সুবিধা পাচ্ছে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান।

চলতি বছরের জুনে চালু হওয়া এ স্কিমের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি নেওয়ার অনীহাকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে তহবিল দিলেও ঋণের মূল ক্রেডিট ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ বা আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি যাচাই করতে হচ্ছে।

স্কিমের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হয়। ব্যাংক নিজস্ব মূল্যায়ন শেষে যোগ্য প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে কম খরচে তহবিল পাওয়ার সুযোগ থাকলেও ঋণগ্রহীতার খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ওপরই বর্তায়।

তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, তাদের যাচাই-বাছাই ও অডিট প্রক্রিয়া শেষে প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানাকে স্কিমের জন্য প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে সংগঠনটির দাবি, এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটি এই তহবিল থেকে অর্থ পায়নি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, তাদের জানা মতে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা এ স্কিমের আওতায় অর্থ পায়নি। কয়েকজন কারখানা মালিকও জানিয়েছেন, আবেদন করার পর তারা এখনো ঋণ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

২০ হাজার কোটি টাকার এ তহবিল মূলত বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য গঠন করা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি স্কিমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে চূড়ান্ত গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারে। ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরুর আগে রয়েছে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি ইচ্ছাকৃত এবং প্রয়োজনীয়। তাঁর মতে, বন্ধ কারখানায় অর্থায়ন বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একটি নতুন ও অপরীক্ষিত মডেল। জনগণের আমানতের অর্থ জড়িত থাকায় আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিস্তারিত যাচাই করতে সময় লাগছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নয়—এমন প্রতিষ্ঠানকে এ সুবিধা দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

ব্যাংকারদের মতে, কম সুদের তহবিল পাওয়া গেলেও বন্ধ কারখানায় নতুন করে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ঋণখেলাপি হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ব্যালান্সশিটেই পড়ে। তাই বাস্তবসম্মতভাবে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা ছাড়া বন্ধ প্রতিষ্ঠানে আমানতকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

এ কারণে কিছু ব্যাংক নতুন অর্থায়নের আগে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের শর্ত দিচ্ছে। অতিরিক্ত জামানত, সম্পদ বিক্রি করে পুরোনো দায় পরিশোধ এবং নতুন ইকুইটি বা মূলধন আনার মতো শর্তও থাকছে এসব ক্ষেত্রে।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন জানান, তাদের ব্যাংক কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণপ্রস্তাব তৈরি করেছে। তবে নতুন ঋণ দেওয়ার আগে অতিরিক্ত জামানত দেওয়া অথবা সম্পদ বিক্রি করে বিদ্যমান দায় সমন্বয়ের মতো শর্ত আরোপ করা হচ্ছে।

আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি ও বেঙ্গল প্লাস্টিকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সম্পদ বিক্রি এবং নতুন ইকুইটি যুক্ত করে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করার পর তুলনামূলক কম খরচে পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদের দাবি, অর্থায়ন দ্রুত না হলে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানা এখন আংশিক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।

ঢাকার নওফস গার্মেন্টস লিমিটেড জানিয়েছে, দুই মাস আগে উত্তরা ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করলেও এখনো অনুমোদন পায়নি তারা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর ইসলাম বলেন, অর্থায়ন না হলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

চট্টগ্রামের ক্লাসিক্যাল ফ্যাশন লিমিটেডও এ স্কিমের আওতায় অর্থায়নের আবেদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৬৫০ থেকে কমে ১৫০ জনে নেমেছে। ৪৫০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে বর্তমানে ১২০টি চালু রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটিকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সামগ্রিক চিত্রেও আবেদন ও বিতরণের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব তহবিলে মোট ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে। এর বিপরীতে বিভিন্ন স্কিমের আওতায় বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব প্রণোদনা প্যাকেজের মূল লক্ষ্য ছিল বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা এবং স্বল্প সুদের অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো। তবে ২০ হাজার কোটি টাকার নির্দিষ্ট এই স্কিমে অর্থ ছাড়ের ধীরগতি এখন তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছে—ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা, ঋণগ্রহীতার আর্থিক পুনর্গঠন এবং ব্যবসা পুনরায় চালুর বাস্তব সম্ভাবনা।

ফলে বড় অঙ্কের তহবিল ঘোষণা হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

সর্বশেষ