দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে খুলেছে রাজধানীর ওসমানী উদ্যান। তবে সংস্কার শেষে চালু হওয়া এই উদ্যানে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ১০ টাকা ফি দিতে হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়েছেন দর্শনার্থীদের কেউ কেউ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন উন্নয়নের নামে বন্ধ রাখার পর এখন প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করে নগরবাসীর জন্য উদ্যানটি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্যানটি উদ্বোধন করেন। পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয় এটি।
রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন ফেসবুকে উদ্যানটি খুলে দেওয়ার খবর পেয়ে সন্তানকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে যান। কিন্তু ফটকে গিয়ে টিকিট কিনতে বলা হলে বিস্মিত হন তিনি। রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘ফেসবুকে দেখলাম, পার্কটি খুলে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চা নিয়ে পার্কে এলাম। গেটেই দুজন থামিয়ে হাতে টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বলেন, দুজনের জন্য ২০ টাকা দেন। এত বছর বন্ধ রাখার পর চালু হলো; কিন্তু ঢুকতে আবার টাকা দিতে হবে—এটা কেমন নিয়ম?’
ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম অবশ্য বলছেন, উদ্যানের পরিবেশ সুন্দর রাখা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, উদ্যানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ জন কর্মী প্রয়োজন। প্রবেশমূল্য না থাকলে আশপাশের হকারসহ বিভিন্ন মানুষ উদ্যানে ঢুকে ময়লা ফেলতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উদ্যানের ফটকে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের কর্মচারী পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ হানিফ বলেন, উন্নয়নকাজে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সিটি করপোরেশন তাঁদের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব দিয়েছে।
তবে নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, পার্কে প্রবেশের জন্য ফি নির্ধারণ করা অন্যায্য। তাঁর মতে, পার্ক ও খেলার মাঠের মতো জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। প্রবেশমূল্য চালু হলে নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষও নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত পরিসর ব্যবহারের সুযোগ কমবে।
তিনি আরও বলেন, প্রবেশমূল্য নির্ধারণের পরিবর্তে উদ্যানের উন্নয়নকাজে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ, অর্থের ব্যবহার এবং কংক্রিটের কাঠামো দিয়ে পার্কের চরিত্র পরিবর্তনের বিষয়গুলো তদন্ত করা উচিত।
উন্নয়নের পরও জলাশয়ে আবর্জনা, কমেছে সবুজ
রাজধানীর গুলিস্তানে ডিএসসিসির নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে অবস্থিত ওসমানী উদ্যানের আয়তন ২১ দশমিক ৮৫ একর। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে উদ্যানটির নামকরণ করা হয়। একসময় প্রচুর গাছপালা থাকায় অনেকে একে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলতেন।
তবে উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের সময় বহু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা ‘ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও গাছ কাটা ও নির্মাণকাজ চলতে থাকে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যানের দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই। অন্যটিতে পানি থাকলেও ভাসছে কচুরিপানা ও প্লাস্টিকের বোতল। এ ছাড়া বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণসামগ্রীও উদ্যানে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, উন্নয়নকাজে পার্কের জায়গায় অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁদের মতে, ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী পার্কের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ থাকলেও এখানে সেই বিধান অনুসরণ করা হয়নি।
দুই বছরের প্রকল্প গড়িয়েছে ৯ বছরে
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নামে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে।
প্রথমে ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশন নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে উদ্যানের ভেতরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে এ কাজের জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নকশায় পরিবর্তনের পর ব্যয় কমিয়ে ৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সব মিলিয়ে গত ৯ বছরে উদ্যানটিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রথম প্রকল্পের ১০৮ কোটি টাকায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেসিয়াম, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, লেকের পাড়, ঘাট, হাঁটার পথ ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্র নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’, যেখানে শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যানের দুই প্রবেশপথে ইংরেজি ‘২৪’ সংখ্যার আদলে দুটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে উদ্যানটি খুলে দেওয়া হলেও নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেসিয়াম, গাড়ি পার্কিং ও খাবারের দোকানগুলো এখনো চালু হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, উদ্যানটি ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ইজারা বা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আগপর্যন্ত সিটি করপোরেশন নিজেই এটি রক্ষণাবেক্ষণ করবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রবেশপথে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর উদ্যানটি খুললেও প্রবেশমূল্য, সবুজ কমে যাওয়া এবং জলাশয়ের অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর নগরবাসী কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে উদ্যানটি ব্যবহার করতে পারবেন, এখন সেটিই আলোচনায়।
























